হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার  নগর পরিকল্পনা সম্পর্কে লেখা

সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতা নগর পরিকল্পনা

ভূমিকা :-  সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতা এক নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এক উন্নত নাগরিক পরিবেশে হরপ্পাবাসীরা উন্নত, আধুনিক জীবন যাপন করত।

 হরপ্পা সভ্যতা নগর পরিকল্পনা : হরপ্পা সভ্যতার নগর পরিকল্পনা গুলি হলো — (১) আঞ্চলিক বিভাজন (২) রাস্তা (৩) ঘরবাড়ি (৪) পয়ঃপ্রণালী (৫) স্নানাগার (৬) হরপ্পার শস্যাগার (৭) নির্মাণশৈলী (৮) নাগরিক স্বাস্থ্য (৯) পৌরব্যবস্থা (১০) রক্ষণশীলতা।

(১) আঞ্চলিক বিভাজন : হরপ্পা নগরটির দুটি অংশ ছিল একটি পশ্চিমের উঁচু দুর্গাঞ্চল, অপরটি পূর্বের নিম্নাঞ্চল। দুর্গাঞ্চলে শাসক শ্রেণির লোকেরা বসবাস করত, আর নিম্নাঞ্চলে সাধারণশ্রেণির মানুষ বসবাস করত। দুর্গ এলাকা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা থাকত। নিরাপত্তার জন্য অনেক সময় উঁচু দুর্গাঞ্চলগুলির চারিদিকে পরিখা থাকত। দেওয়ালগুলির কোণে কোণে গম্বুজ বা তোরণ ছিল।

(২) রাস্তা : সরল ও প্রশস্ত রাস্তাগুলি পূর্ব থেকে পশ্চিম ও উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে সমান্তরালভাবে বিস্তৃত ছিল।বেশিরভাগ রাস্তা একে অপরকে সমকোণে ছেদ করায় শহরগুলি বর্গাকার ও আয়তাকার ব্লকের রূপ নিয়েছে। মূলরাস্তাগুলি ৯ থেকে ৩৪ ফুট চওড়া। রাস্তাগুলি ছিল চুন, সুরকি, পাথর ও পোড়া ইট দিয়ে তৈরি। রাস্তার দুপাশে বাধানো ফুটপাতে রাত্রে আলোর জন্য ছিল ল্যাম্পপোস্ট, আর ফুটপাত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য ছিল ডাস্টবিন।

(৩) ঘরবাড়ি : আগুনে পোড়ানো বা রোদে শুকানো দুই ধরনের ইট দিয়েই ঘরবাড়ি তৈরি করা হত। দু-কামরাবিশিষ্ট ছোটো গৃহ থেকে ত্রিশ কামরাবিশিষ্ট একতলা, দোতলা বা তিনতলা বাড়ির পাশাপাশি নিম্ন অঞ্চলের উপকণ্ঠে শ্রমিক ও গরিব শ্রেণির বস্তি গড়ে উঠেছিল। বসতবাড়ি ছাড়াও পাবলিক হল ও কিছু দোকান ঘরের অস্তিত্ব ছিল। কাদামাটিতে চুন মিশিয়ে, অথবা খড় বা ঘাস মিশিয়ে বাড়ির দেওয়ালগুলি প্রলেপ দেওয়া হত। প্রতিটি গৃহেই শোবার ঘর, বসার ঘর, রান্নাঘর, স্নানঘর ও শৌচাগারের ব্যবস্থা ছিল। খনন কার্যের ফলে পোড়া ইটের বাঁধানো কূপ আবিষ্কৃত হয়েছে। অধিকাংশ বাড়িতে রাস্তার দিকে কোনো দরজা-জানালা না রেখে ভেতরের উঠোনের দিকে দু-একটি জানালা, দরজা রাখা হত। অধ্যাপক শিরিন রত্নাগরের মতে—“মহেন-জো-দারোর বাড়িগুলি আকারে-গড়নে অসম্ভব বৈচিত্র্যপূর্ণ।” 

(৪) পয়ঃপ্রণালী : হরপ্পা সভ্যতার পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত আধুনিক। জলনিকাশের জন্য রাস্তার নীচে দিয়ে পাথরের ঢাকনা দেওয়া ঢাকা নর্দমা থাকত। নর্দমাগুলি পরিষ্কার করার জন্য ইটের তৈরি ঢাকা ম্যানহোলের ব্যবস্থা ছিল। বড়ো নর্দমার সঙ্গে যুক্ত ছোটো নর্দমা দিয়ে প্রতিটি বাড়ির নোংরা জল বের করা হত। এ. এল. ব্যাসামের মতে, “রোমান সভ্যতার পূর্বে পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাচীন সভ্যতায় এত উন্নত পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা ছিল না।” (No other ancient civilization until that of the Romans had so efficient a system of drains) 

(৫) স্নানাগার : মহেন-জো-দারোর দুর্গাঞ্চলে সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য এক বিশাল বাঁধানো স্নানাগারের অস্তিত্ব মিলেছে। এর আয়তন দৈর্ঘ্যে ১৮০ ফুট ও প্রস্থ ১০৮ ফুট; চারিদিকে রয়েছে ৮ ফুট উঁচু ইটের দেওয়াল। স্নানাগারটির মাঝখানে রয়েছে একটি জলাশয় যা ৩৯ ফুট লম্বা, ২৩ ফুট চওড়া এবং ৮ ফুট গভীর। চারিদিকে ৩ মিটার পুরু শিলাজতু (বিটুমেন)-র প্রলেপ লাগিয়ে এটিকে জলনিরোধক করা হয়। ঋতুভেদে জল গরম অথবা ঠান্ডা করার ব্যবস্থা ছিল। কাছের এক কূপ থেকে স্নানাগারটিতে জল সরবরাহ এবং পয়ঃপ্রণালীর দ্বারা এখানকার ময়লা জল বের করার ব্যবস্থা ছিল। জলাধারটির তিনদিকে বারান্দা এবং একদিকে কয়েকটি ছোটো আকারের ঘর ছিল। এই ঘরগুলিতে সম্ভবত পোশাক পরিবর্তন ও বিশ্রাম নেওয়া হত। স্নানাগারটিতে নামা-ওঠার জন্য দুপাশে ইটের সিঁড়ি ছিল। মার্টিমার হুইলারের মতে, “স্থানাগারটি ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হত”।

(৬) হরপ্পার শস্যাগার : মহেন-জো-দারো ও হরপ্পা দুই নগরে দুটি বিশাল আকারের শস্যাগার আবিষ্কৃত হয়েছে। হরপ্পার শস্যাগারটি রাভি নদীর প্রাচীন খাতের কাছে অবস্থিত ছিল বলে জানা গেছে। এই শস্যাগারটির ভিতরে রয়েছে দুই সারি মঞ। প্রতিটি সারিতে ছয়টি করে মোট বারোটি মঞ্চ অবস্থিত। প্রতিটি মঞ্চ ৫০ ফুট × ২০ ফুট আয়তনবিশিষ্ট। দুই সারি মঞ্চের মাঝে রয়েছে ২৩ ফুট চওড়া চলাচলের জায়গা। শস্যাগারটিতে শস্য যাতে সতেজ থাকে তার জন্য হাওয়া বাতাস চলাচলের ঘুলঘুলির ব্যবস্থা ছিল। শস্যাগারটির ঠিক দক্ষিণে রয়েছে একটি বৃহৎ মঞ্চ, যাতে কয়েকটি গোলাকার গর্ত লক্ষ করা যায়। এই গর্তগুলিতে শস্যের দানা মেলায়, অনুমান করা হয়, এখানে শস্য পেষাই বা ঝাড়াই-এর কাজ করা হত। ওই মঞ্চের দক্ষিণ দিকে ছিল দুই সারি ক্ষুদ্র বাসগৃহ।

(৭) নির্মাণশৈলী : হরপ্পার নির্মাণশৈলী ছিল অপূর্ব। আগাগোড়া পরিকল্পনামাফিক নগর তৈরি করা হয়েছিল। ঘরবাড়ি নির্মাণ, রাস্তাঘাট, জলনিকাশি ব্যবস্থা সবকিছুতেই ছিল সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ছাপ। নগরের গঠনবিন্যাস দেখে যে নির্মাণশৈলীর নমুনা মেলে, তা আধুনিক নগরের সঙ্গে তুলনীয়।

(৮) নাগরিক স্বাস্থ্য : হরপ্পা সভ্যতার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা উন্নত নাগরিক স্বাস্থ্যের পরিচায়ক। প্রত্যেকটি বাড়িতেই কুয়ো ছিল। ঘরগুলির মধ্যে বায়ু চলাচলের সুবিধার জন্য ঘরের ওপরের দিকে পাথরের ঝাঁঝরি লাগানো হত। প্রতিটি বাড়ির সামনে বাঁধানো ডাস্টবিন ছিল। ইতিহাসবিদ রামশরণ শর্মার মতে, “হরপ্পা সভ্যতার মতো বিশ্বের অন্য কোনো সভ্যতা স্বাস্থ্য ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি নজর দেয়নি।”

(৯) পৌরব্যবস্থা : নগরগুলিতে কেন্দ্রীভূত পৌরব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল। নগরগুলির দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করত পৌর প্রতিষ্ঠান। নাগরিক পৌর শাসনব্যবস্থার মান ছিল উন্নত। উন্নত পৌরব্যবস্থায় নাগরিকরা সুখেস্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটাতেন। অধ্যাপক সরসীকুমার সরস্বতীর মতে, “এখানে একই প্রকৃতির শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা ছিল যা জনগণের জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করত।”

(১০) রক্ষণশীলতা : হরপ্পা সভ্যতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে খননকার্যের ফলে মহেন-জো-দারোতে একটি ও হরপ্পায় আটটি স্তর পাওয়া গেছে। শত সহস্র বছর ধরে এই স্তরভিত্তিক জীবনযাত্রায় রক্ষণশীল মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। মানুষের জীবনযাত্রা প্রণালী, নগরগঠন রীতি, হস্তলিপি, ওজন এবং মাপ সব দিক থেকেই এক ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। তাই অধ্যাপক এ. এল. ব্যাসাম বলেছেন, “রক্ষণশীলতা বা ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এই সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।”

মূল্যায়ন: সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার নগর পরিকল্পনা আধুনিক যুগের মতোই উন্নত বা বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল। সুষ্ঠু নাগরিক পরিকল্পনা নগরবাসীকে সুখস্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাত্রা উপহার দিয়েছিল। প্রাচীনযুগের এমন উন্নত নগর পরিকল্পনা শুধু প্রাচীন ভারত নয়, সমগ্র বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতার এক অনন্য নজির।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Job description social media executive. Hammers dm developments north west.