সুচেতনা’ কবিতার মর্মার্থ আলোচনা করো।  অথবা  ‘সুচেতনা’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।  অথবা   ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি শুভ চেতনার আহ্বান জানিয়েছেন- আলোচনা করো।

রবীন্দ্র পরবর্তী সময়কালে বাংলা কাব্যসাহিত্যে জীবনানন্দ দাশ একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর কবিতার মধ্যে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- ইতিহাস চেতনা ও সময়জ্ঞান। কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি সর্বদা এক সুগভীর ব্যঞ্জনাকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর অধিকাংশ কবিতার মধ্যেই দ্বৈত ভাবনা ব্যক্ত হয়েছে। আমাদের আলোচ্য ‘সুচেতনা’ কবিতাটিও একটি ব্যঞ্জনাধর্মী কবিতা। ‘সুচেতনা’ কবিতাটি ‘বনলতা সেন’ (১৯৩৫) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। জীবনানন্দ দাশ নায়িকার নামে অনেক কবিতাই রচনা করেছেন, কিন্তু সেখানে নায়িকার স্বরূপ ও সৌন্দর্য গুরুত্ব পায়নি, নায়িকার নামকরণের তীব্র ব্যঞ্জনাগত ভাবনাই প্রাধান্য পেয়েছে। জীবনানন্দ দাশ কবিতার বিষয় সম্পর্কে লিখেছেন- “কবিতার অস্থির মধ্যে থাকবে ইতিহাস চেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান।” ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় তিনি নিজেকে আধুনিক জীবন যন্ত্রণায় দগ্ধ হিসেবে তুলে ধরেছেন। আবার ইতিহাসের পথে পথে ক্লান্তিহীন যাত্রার কথাও ব্যক্ত হয়েছে তাঁর কবিতায়। ‘সুচেতনা’ কবিতার মধ্যেও এই একই ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে।

জীবনানন্দ দাশ ‘সুচেতনা’ কবিতাটির শুরু করেছেন এভাবে-

“সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ বিকেলের নক্ষত্রের কাছে; সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে নির্জনতা আছে।”

কবিতার এই অংশটি পাঠ করে পাঠকমাত্রই মনে হতে পারে, কবি তাঁর প্রেমিকা সুচেতনাকে না পাওয়ার জন্য হৃদয়ের চরম যন্ত্রণা প্রকাশিত হয়েছে। আসলে কিন্তু তা নয়। এখানে সুচেতনা কোনো মানবী নায়িকা নয়, সুচেতনা হলো মানুষের শুভ চেতনা। কবি আবেগ ও জ্ঞানের মিলন ঘটিয়ে মানুষের মধ্যে এই শুভ চেতনার বিকাশ ঘটাতে চেয়েছেন।

কবি অনুভব করেছিলেন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়েই পৃথিবীতে গড়ে ওঠে আধুনিক সভ্যতা। এই আধুনিক সভ্যতার পথ ধরেই কলকাতাও একদিন ‘কল্লোলিনী তিলোত্তমা’ হয়ে উঠবে বলে কবির বিশ্বাস। সভ্যতার এই বাহ্যিক অগ্রগতি সত্য, কিন্তু মানব ইতিহাসের শেষ কথা নয়। কবির কাছে শেষ সত্য- মানবতা, সুস্থতা, ভালোবাসা, নির্জন স্নিগ্ধতা। কবি কলকাতার উন্নয়নের যাবতীয় উদ্যোগের মধ্যে শুভ চেতনাকেই প্রত্যাশা করেছেন। কবি লিখেছেন-

“এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা

সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।

কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে;

তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়।”

প্রাণচঞ্চল এই পৃথিবীতে কবি একাকি ক্লান্ত পথিক। প্রখর রোদের তাপে দগ্ধ হয়েও মানুষকে ভালোবাসতে গিয়ে কবি দেখেছেন- অমানবিক হিংসা, ঈর্ষা ও প্রেমহীনতার দৃষ্টান্ত। তাই কবির মনে হয়েছে, তাঁর নিজেরই হাতে হয়তো নিহত হয়েছে পরিবার-পরিজন। পৃথিবী প্রেমহীনতার চরম ব্যাধিতে আক্রান্ত। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ আশাবাদী কবি। তিনি মানবতায় বিশ্বাসী। কবি লিখেছেন-

“পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন; মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।”

ইতিহাসের পদচারণা কখনোই জীবনের শেষ সত্য নয়। এই রক্তাক্ত পৃথিবী বুদ্ধ ও কনফুসিয়াসের মতো মণীষীদের সাধনার দ্বারাই প্রাণ ফিরে পেয়েছিল, যাঁরা মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন, মানবতার প্রচার করেছেন। তাঁরাও এই আধুনিক সভ্যতার পটভূমিতে মূক, নির্বাক। তবুও কবির বিশ্বাস শুভ চেতনার পথ ধরেই একদিন পৃথিবীর ক্রমমুক্তি ঘটবে-

“সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে- এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে।”

একটি সুস্থ-সুন্দর মানব সভ্যতা গড়ে তোলার প্রত্যাশায় কবি মানুষের মধ্যে শুভ চেতনাকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। সভ্যতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু মানুষের ক্লান্তিহীনতার কারণে কবি আরো বেশি আশাবাদী হয়ে ওঠেন।

কারণ তিনি জানেন-

“শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়।”

রাত্রির পরেই আসে সূর্যোদয়। আলোর প্রত্যাশাই অন্ধকারকে অতিক্রম করার পথ দেখায়। এক্ষেত্রে মানুষের শুভ চেতনার ওপর বিশ্বাস রাখতে হয়। কবি এই শুভ চেতনাকেই নারীর নামকরণের প্রতীকী ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছেন। এখানেই কবিতাটির সার্থকতা এবং নামকরণ সার্থক।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Graphic designer job. About us dm developments north west. Proliferation of small arms and ethnic conflicts in nigeria : implication for national security.