সমর সেনের ‘মেঘদূত’ কবিতায় বর্ণিত প্রেমভাবনার পরিচয় দাও।  অথবা  ‘মেঘদূত’ কবিতাটির ভাববস্তু বিশ্লেষণ করো।  অথবা  ‘মেঘদূত’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার |

কবি সমর সেনের ‘মেঘদূত’ কবিতাটি ‘কয়েকটি কবিতা’ (১৯৩৭) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। মহাকবি কালিদাসের লেখা একটি বিখ্যাত প্রেমের কাব্য ‘মেঘদূত’। এই কাব্যের মধ্যে কুবেরের অনুচর যক্ষের বিরহবেদনা ও স্ত্রীর প্রতি প্রেম-ভালোবাসার অনন্য প্রকাশ ঘটেছে। কালিদাসের এই ‘মেঘদূত’ কাব্যকে অবলম্বন করে পরবর্তীকালে বিভিন্ন সাহিত্য রচিত হয়েছে। আধুনিক কবি সময় সেন ‘মেঘদূত’ কবিতায় সেই চিরন্তন প্রেমের নব মূল্যায়ণ করেছেন। এই দিক থেকে কবিতার নামকরণ সার্থক।

                                 কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কবিতায় দেখা যায়, যক্ষ তার সুন্দরী স্ত্রীর কথা চিন্তা করতে গিয়ে কর্তব্যে অবহেলার জন্য প্রভুর অভিশাপে এক বৎসরের জন্য অলকাপুরী থেকে রামগিরি পর্বতে নির্বাসন দণ্ড ভোগ করে। নির্বাসনকালে বাস্তব ও কল্পনার ভেদাভেদ ভুলে যক্ষ আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে মেঘকে, তার প্রিয় পত্নীর কাছে বিরহবেদনা ও মিলনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য দূত হিসেবে নিযুক্ত করে। মেঘ সেই বার্তা নিয়ে প্রাচীন ভারতবর্ষের নদী- পর্বত-নগরী-জনপদের উপর দিয়ে ভেসে যায় অলকাপুরীর দিকে।

সমর সেনের ‘মেঘদূত’ কবিতাতেও সেই বিরহবেদনার পরিচয় রয়েছে। এক দরিদ্র অসহায় নারীর বিরহবেদনার পরিচয় রয়েছে এখানে। বিবাহিতা অথচ স্বামী বিচ্ছিন্না সেই নারী ছেলে ভুলানো ছড়া গেয়ে ছেলেকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই কবি তার বিবাহিত জীবনের পরিচয় দিতে চেয়েছেন। তার সুর ক্লান্ত। সেই সুর যেন-

“ঝরে যাওয়া পাতার মতো হাওয়ায় ভাসছে,

আর মাঝে মাঝে আগুন জ্বলছে অন্ধকার আকাশের বনে।”

এখানে মেয়েটির জীবনের বিরহবেদনার ইঙ্গিতটি স্পষ্ট। তার ছড়ার সুরে কোনো আনন্দ নেই। আছে শুধু দিন যাপনের ক্লান্তি আর হতাশা। অন্ধকার আকাশে মাঝে মাঝে বনে আগুন জ্বলার ঘটনার মধ্য দিয়ে দারিদ্রপীড়িত জীবনের ইঙ্গিতটি স্পষ্ট হয়েছে। আবার এই চিত্রকল্পটির মধ্য দিয়ে স্বামী বিচ্ছিন্না এক নারীর হৃদয়ে মাঝে মাঝে জেগে ওঠা তীব্র কামনা- বাসনাকেও ইঙ্গিত করে।

কবি নরনারীর জীবনে জৈবিক মিলনের প্রাসঙ্গিকতা অন্বেষণের চেষ্টা করেছেন। প্রকৃতি জগতে যখন ভাঙন দেখা যায়, ঝড়-বৃষ্টি-বন্যায় যখন ঘরবাড়ি ভেঙে গিয়ে মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে, যখন সমাজসেবক ও স্বেচ্ছাসেবকের দল সেইসব অসহায় মানুষের জন্য অন্ন-বস্ত্র সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখনও নারীর হৃদয়ে থাকে মিলনের আকাঙ্ক্ষা। কবির কথায়-

“শহরের রাস্তায় যখন

সদলবলে গাইবে দুর্ভিক্ষের স্বেচ্ছাসেবক,

তোমার মনে তখন মিলনের বিলাস।”

স্বামী বিচ্ছিন্না বিবাহিতা মেয়েটি নিছক জৈবিক তাড়নায় ফিরে যেতে চায় তার স্বামীর কাছে। মধ্যবিত্তের হতাশাগ্রস্ত জীবনের মধ্যেও নরনারীর জৈবিক কামনা-বাসনার এই চরম বাস্তবতা- কবিকে এক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। তাই তিনি জানতে চেয়েছেন—

“হে ম্লান মেয়ে, প্রেমে কী আনন্দ পাও,

 কী আনন্দ পাও সন্তানধারণে?”

সমর সেন মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের কবি। তিনি হৃদয়ের আবেগের তুলনায় বুদ্ধির বিচারকেই অধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথ ‘মেঘদূত’ কাব্যে বিরহবেদনার মধ্যেও রোমান্টিক প্রেমের জয়গান করেছেন, কিন্তু সমর সেন আধুনিক বুদ্ধিদীপ্ত মানসিকতায় বাস্তবজীবনের বিরহবেদনা, দারিদ্র্য ও যন্ত্রণার প্রেক্ষাপটে রোমান্টিক প্রেম, এমনকি নারীর মাতৃরূপকেও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেছেন।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

One liner gk general knowledge questions asked in compitative exams in kannada kpsc ,psi pc exams. Bespoke kitchens dm developments north west. Pharmacy practice notes pdf :.