সমরেশ বসুর ‘আদাব’ গল্পটিতে দাঙ্গার যে ছবি আছে তার স্বরূপ উদ্ঘাটন করো।

শহরে ১৪৪ ধারা আর কারফিউ অর্ডার জারী হয়েছে। দাঙ্গা বেধেছে হিন্দু আর মুসলমানে। মুখোমুখি লড়াই—দা, সড়কি, ছুরি, লাঠি নিয়ে। তা ছাড়া চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে গুপ্তঘাতকের দল—চোরাগোপ্তা হানছে অন্ধকারকে আশ্রয় করে।

লুঠেরা-রা বেরিয়েছে তাদের অভিযানে। মৃত্যু-বিভীষিকাময় এই অন্ধকার রাত্রি তাদের উল্লাসকে তীব্রতর করে তুলেছে। বস্তিতে বস্তিতে জ্বলছে আগুন। মৃত্যুকাতর নারী-শিশুর চীৎকার স্থানে স্থানে আবহাওয়াকে বীভৎস করে তুলেছে। তার উপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সৈন্যবাহী-গাড়ী। তারা গুলি ছড়ছে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে।

দুদিক থেকে দুটো গলি এসে মিশেছে এ জায়গায়। ডাস্টবিনটা উল্টে এসে পড়েছে গলি দুটোর মাঝখানে খানিকটা ভাঙাচোরা অবস্থায়। সেটাকে আড়াল করে গলির ভিতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল একটি লোক। মাথা তুলতে সাহস হল না, নির্জীবের মত পড়ে রইল খানিকক্ষণ। কান পেতে রইল দূরের অপরিস্ফুট কলরবের দিকে। কিছু বোঝা যায় না। ‘আল্লাহু-আকবর’ কি ‘বন্দেমাতারম’।

হঠাৎ ডাস্টবিনটা একটু নড়ে উঠল। আচম্বতে শিরশিরিয়ে উঠল দেহের সমস্ত শিরা-উপশিরা। দাঁতে দাঁত চেপে হাত পা-গুলোকে কঠিন করে লোকটা প্রতীক্ষা করে রইল একটা ভীষণ কিছুর জন্য। কয়েকটা মুহূর্ত কাটে।…নিশ্চল নিস্তব্ধ চারিদিক।

বোধ হয় কুকুর। তাড়া দেওয়ার জন্যে লোকটা ডাস্টবিনটাকে ঠেলে দিল একটু। খানিকক্ষণ চুপচাপ। আবার নড়ে উঠল ডাস্টবিনটা, ভয়ের সঙ্গে এবার একটু কৌতুহল। আস্তে আস্তে মাথা তুলল…ওপাশ থেকেও উঠে এল ঠিক তেমনি একটি মানুষ। ডাস্টবিনের দুই পাশে দুটি প্রাণী নিস্পন্দ নিশ্চল। হৃদয়ের স্পন্দন তালহারা—ধীর…। স্থির চারটে চোখের দৃষ্টি ভয়ে সন্দেহে উত্তেজনায় তীব্র হয়ে উঠেছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। উভয়ে উভয়কে ভাবছে খুনী। চোখে চোখ রেখে উভয়েই একটা আক্রমণের প্রতীক্ষা করতে থাকে, কিন্তু খানিকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোন পক্ষ থেকেই আক্রমণ এল না। এবার দুজনের মনেই একটা প্রশ্ন জাগল—হিন্দু না মুসলমান? এ প্রশ্নের উত্তর পেলেই হয় তো মারাত্মক পরিণতিটা দেখা দেবে। তাই সাহস করছে না কেউ কাউকে সে কথা জিজ্ঞেস করতে। প্রাণভীত দুটি প্রাণী পালাতেও পারছে না—ছুরি হাতে আততায়ীর ঝাঁপিয়ে পড়ার ভয়ে।

অনেকক্ষণ এই সন্দিহান ও অস্বস্তিকর অবস্থায় দুজনেই অধৈর্য হয়ে পড়ে। একজন শেষ অবধি প্রশ্ন করে ফেলে–হিন্দু না মুসলমান?

–আগে তুমি কও। অপর লোকটি জবাব দেয়। 

পরিচয়কে স্বীকার করতে উভয়েই নারাজ। সন্দেহের দোলায় তাদের মন দুলছে। …প্রথম প্রশ্নটা চাপা পড়ে, অন্য কথা আসে। একজন জিজ্ঞেস করে—বাড়ি কোনখানে?

–বুড়িগঙ্গার হেইপারে—সুবইডায়। তোমার?

–চাষাড়া—নারাইণগঞ্জের কাছে।…কী কাম কর?

–নাও আছে আমার, না’য়ের মাঝি।–তুমি?

–নারাইণগঞ্জের সুতাকলে কাম করি।

আবার চুপচাপ। অলক্ষ্যে অন্ধকারের মধ্যে দুজনে দুজনের চেহারাটা দেখবার চেষ্টা করে। চেষ্টা করে উভয়ের পোশাক পরিচ্ছদটা খুঁটিয়ে দেখতে। অন্ধকার আর ডাস্টবিনটার আড়াল সেদিক থেকে অসুবিধা ঘটিয়েছে।… হঠাৎ কাছাকাছি কোথায় একটা শোরগোল ওঠে। শোনা যায় দুপক্ষেরই উন্মত্ত কণ্ঠের ধ্বনি। সুতাকলের মজুর আর নাওয়ের মাঝি দুজনেই সন্ত্রস্ত হয়ে একটু নড়েচড়ে ওঠে।

–ধারে-কাছেই য্যান লাগছে। সুতা-মজুরের কণ্ঠে আতঙ্ক দুটে উঠল।

–হ, চল এইখান থেইক্যা উইঠ্যা যাই। মাঝিও বলে উঠল অনুরূপ কণ্ঠে।

সুতামজুর বাধা দিল; আরে না না—উইঠো না। জানটারে দিবা নাকি?

মাঝির মন আবার সন্দেহে দুলে উঠল। লোকটার কোন বদ অভিপ্রায় নেই তো। সুতা-মজুরের চোখের দিকে তাকাল সে! সুতা-মজুরও তাকিয়েছিল, চোখে চোখ পড়তেই বলল—বইয়ো। যেমুন বইয়া রইছ—সেই রকমই থাক। 

মাঝির মনটা ছাঁৎ করে উঠল সুতা-মজুরের কথায়। লোকটা কি তাহলে তাকে যেতে দেবে না নাকি। তার সারা চোখে সন্দেহ আবার ঘনিয়ে এল। জিজ্ঞেস করল—ক্যান?

-ক্যান? সুতা-মজুরের চাপা গলায় বেজে উঠল–ক্যান কি, মরতে যাইবা নাকি তুমি?

কথা বলার ভঙ্গিটা মাঝির ভাল ঠেকল না। সম্ভব-অসম্ভব নানারকম ভেবে সে মনে মনে দৃঢ় হয়ে উঠল। –যামু না কি আন্দাইরা গলির ভিতরে পইড়া থাকুম নাকি?

লোকটার গলায় জেদ দেখে সুতা-মজুরের গলায়ও ফুটে উঠল সন্দেহ। বলল—তোমার মতলবটা তো ভাল মনে হইতেছে না। কোন জাতির লোক তুমি কইলা না, শেষে তোমাগো দলবল যদি ডাইকা লইয়া আহ আমারে মারণের লাইগা?

–এইটা কেমুন কথা কও তুমি? স্থান-কাল ভুলে রাগে দুঃখে মাঝি প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে।

–ভাল কথাই কইছি ভাই; বইয়ো মানুষের মন বোঝো না?

সুতা-মজুরের গলায় যেন কী ছিল… মাঝি একটু আশ্বস্ত হল শুনে।

–তুমি চইলা গেলে আমি একলা থাকুম নাকি?

শোরগোলটা মিলিয়ে গেল দূরে। আবার মৃত্যুর মত নিস্তদ্ধ হয়ে আসে সব—মুহূর্তগুলিও কাটে যেন মৃত্যুর প্রতীক্ষার মত। অন্ধকারে গলির মধ্যে ডাস্টবিনের দুই পাশে দুটি প্রাণী ভাবে নিজেদের বিপদের কথা, ঘরের কথা, মা-বউ ছেলেমেয়েদের কথা…তাদের কাছে কি আর তারা প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারবে না, না তারাই থাকবে বেঁচে—কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ কোত্থেকে বজ্রপাতের মত নেমে এল দাংগা। এই হাটে-বাজারে দোকানে এত হাসাহাসি, কথা কোওয়াকওয়ি—আবার মুহূর্তেই মারামারি, কাটাকাটি—একেবারে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিল। এমনভাবে মানুষ নির্মম নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে কী করে? কি অভিশপ্ত জাত! সুতা-মজুর এটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে। দেখাদেখি মাঝিরও একটা নিশ্বাস পড়ে।

–বিড়ি খাইবা? সুতা-মজুর পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে বাড়িয়ে দিল মাঝির দিকে। মাঝি বিড়িটা নিয়ে অভ্যাসমত দুএকবার টিপে, কানের কাছে বার কয়েক ঘুরিয়ে চেপে ধরল ঠোঁটের ফাঁকে। সুতা-মজুর তখন দেশলাই জ্বালবার চেষ্টা করছে। আগে লক্ষ্য করেনি জামাটা কখন ভিজে গেছে। দেশলইটাও গেছে সেঁতিয়ে। বার কয়েক খসখস শব্দের মধ্যে শুধু এক আধটা নীলচে ঝিলিক দিয়ে উঠল। বারুদ-ঝরা কাঠিটা ফেলে দিল বিরক্ত হয়ে।

–হালার ম্যাচবাতি গেছে সোঁতাইয়া।–আর একটা কাঠি বের করল সে।

মাঝি যেন খানিকটা অসবুর হয়েই উঠে এল সুতা-মজুরের পাশে।

–আরে জ্বলব জ্বলব, দেও দেহিনি—আমার কাছে দেও। সুতা-মজুরের হাত থেকে দেশলাইটা সে ছিনিয়েই নিল। দু’একবার খসখস করে সত্যিই জ্বালিয়ে ফেলল একটা কাঠি।

–সোবহান আল্লা।–নেও নেও—ধরাও তাড়াতাড়ি। ভুত দেখার মত চমকে উঠল সুতা-মজুর। টেপা ঠোঁটের ফাঁক থেকে পড়ে গেল বিড়িটা।

–তুমি?

একটা হালকা বাতাস এসে যেন ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল কাঠিটা। অন্ধকারের মধ্যে দু’জোড়া চোখ অবিশ্বাসের উত্তেজনায় আবার বড় বড় হয়ে উঠল। বলল—হ আমি মোছলমান। –কী হইছে?

সুতা-মজুর ভয়ে ভয়ে জবাব দিল—কিছু হয় নাই, কিন্তু…

মাঝির বগলের পুটুলিটা দেখিয়ে বলল, ওইটার মধ্যে কী আছে?

–পোলা-মাইয়ার লেইগা দুইটা জামা আর একখান শাড়ি। কাইল আমাগো ঈদ পরব জানো?

–আর কিছু নাই তো?–সুতা-মজুরের অবিশ্বাস দূর হতে চায় না।

–মিথ্যে কথা কইতেছি নাকি? বিশ্বাস না হয় দেখ। পুঁটুলিটা বাড়িয়ে দিল সে সুতা-মজুরের দিকে।

আরে না না ভাই, দেখুম আর কী। তবে দিনকালটা দেখছ ত? বিশ্বাস করণ যায়—তুমিই কও?

–হেই তো হক কথাই। ভাই—তুমি কিছু রাখ-টাখ নাই ত?

–ভগবানের কিরা কইতে পারি একটা সুঁইও নাই। পরানটা লইয়া অখন ঘরের পোলা ঘরে ফিরা যাইতে পারলে হয়। সুতা-মজুর জামা-কাপড় নেড়ে দেখায়।

আবার দু’জনে বসল পাশাপাশি। বিড়ি ধরিয়ে নীরবে বেশ মনোযোগ-সহকারে দুজনে ধুমপান করল খানিকক্ষণ।

–আইচ্ছা…মাঝি এমনভাবে কথা বলে যেন তার কোন আত্মীয় বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে। 

–আইচ্ছা—আমারে কইতে পারনি—এই মাই’র-দ’ইর কাটাকুটি কিয়ের লেইগা?

সুতা-মজুর খবরের কাগজের সঙ্গে সম্বন্ধ রাখে, খবরাখবর সে জানে কিছু। বেশ উষ্ণকণ্ঠেই জবাব দিল সে—দোষ ত’ তোমাগো ওই লীগোয়ালোগোই। তারাই ত লাগাইছে হেই কিয়ের সংগ্রামের নাম কইরা।

মাঝি একটু কটুক্তি করে ইঠল—হেই সব বুঝি না। আমি জিগাই মারামারি কইরা হইব কী? তোমাগো দু’গ লোক মরব। তাতে দ্যাশের কী উপকারটা হইব?

–আরে আমিও ত হেই কথাই কই। হইব আর কি, হইব আমার এই কলাটা—হাতের বুড়ো আঙুল দেখায় সে।–তুমি মরবা, আমি মরুম আর আমাগো পলামাইয়াগুলি ভিক্ষা কইরা বেড়াইব। এই গেল-সনের রায়টে আমার ভগ্নিপতিরে কাইটা চাইর টুকরা কইরা মারল। ফলে বইন হইল বিধবা আর তার পোলামাইয়ারা আইয়া পড়ল আমার ঘাড়ের উপুর। কই কি আর সাধে, ন্যাতারা হেই সাততলার উপুর পায়ের উপুর পা দিয়ে হুকুম জারী কইরা বইয়া রইল আর হালার মরলাম আমরাই!

 

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Compitative exams mcq questions and answers. Bespoke kitchens dm developments north west. Industrial pharmacy 7th semester notes pdf download.