“সমগ্র মেঘনাদবধ কাব্য’ জুড়িয়া নিয়তিবাদ ও করুণ রসের ছড়াছড়ি!” দৃষ্টিত্তসহ বিষয়টি আলোচনা করো।

প্রথম কাব্য ‘তিলোত্তমা’-র অনুরূপ অভিলাষ ব্যক্ত হয়নি, সেখানে যা বিষয়বস্তু তাতে বীররস উৎসারিত করার সুযোগও ছিল না। এ বিষয়েও সচেতন ছিলেন মধুসূদন; তাই এবার তিনি বেছে নিলেন যুদ্ধ মুখর ঘটনা এবং রামকে নয়, রাবণ ও ইন্দ্রজিৎকে গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপ্য বিষয়কে তিনি এমন করেই পরিকল্পনা করতে চাইলেন যাতে যুদ্ধ ও তার বীরত্বব্যঞ্জক রৌরব মুখ্য হয়ে ওঠার সমস্তরকম সুযোগ পায়। বীররস প্রভাসক ছন্দ তো তাঁর করায়ত্ত ছিলই। অতএব বলা যায়, যা তিনি অভিলাষ করেছিলেন, তা বাতুল উচ্চাশা না, তার জন্য নিজেকে তিনি সচেতনভাবে প্রস্তুতও করেছিলেন।

কিন্তু আমরা জানি, কাব্যের আবির্ভাবপথ সব সময় কবির সজ্ঞা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের ক্ষেত্রে কি হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সমালোচকদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে, তবে অধিকাংশেই বলেছেন যে মধুসুদনের ব্যক্তি জীবনে যেমন প্রায়শঃ সাধ ও সাধিতের মধ্যে সমন্বয় থাকে নি, ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের ক্ষেত্রেও ঘটেছে ঠিক তা-ই, তিনি লিখতে চেয়েছেন বীররসের কাব্য, কিন্তু কাব্যটি হয়ে উছেছে করুণ রসের। জীবনের সঙ্গে কাব্যের এই মিল অবশ্যই আকস্মিক, কিন্তু সেই মিলটাকেও স্বীকার করারআগে আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার করুণরস সত্যিই কাব্যটির অঙ্গীরস বা মূল হয়ে উঠেছে কিনা। —

‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের শুরু হয়েছে বীরবাহুর মৃত্যু-প্রসঙ্গ দিয়ে। ভগ্নকৃত আনীত ও দুঃসংবাদে রাবণ মর্মাহত হয়ে পড়েছেন, রাজদুঃখে দুঃখিত হয়েছেন সভায় সকলে। বিস্তর বিলাপের পর মন্ত্রী সারণের সান্ত্বনাবাণীতে কিছুটা শনিত হয়ে তিনি নকরাক্ষের কাছে শুনতে চেয়েছেন বীরবাহুর ধীরগতি প্রাপ্তির অনুপুঙ্খ বর্ণনা। ভগ্নদূত বীরবাহর যুদ্ধকথা এমন ভাবে বর্ণনা করেছে যাতে বিলসিত হয়ে উঠেছে বীররস। অবশ্য শেষ পর্যন্ত আবার তাকে নীরবে কাদতে হয়েছে বীরবাহুর মৃত্যু-কথায়। রাবণের যুদ্ধক্ষেত্র দর্শন ও তাঁর সংবেদনায় করুণ রস ও বীররস রয়েছে পাশাপাশি। একই কথা বলা যায় চিত্রাঙ্গদা প্রসঙ্গে। পুত্রশোকে কাদতে কাঁদতে তিনি রাজসভায় এলে ‘শোকের ঝড় বহিল সভাতে’, কিন্তু প্রশ্নে-প্রশ্নে রাকাকে যেভাবে তিনি আক্রমণ ও পর্যুদস্ত করেছেন এবং লঙ্কার এ অবস্থার জন্য তাকেই দায়ী। প্রতিপন্ন করেছেন, তাতে কারুণাকে চাপা দিয়ে বিক্রীড়িত হয়ে উঠেছে বৌদ্ধিক উদ্দীপনা— তথা বীররস। রাবণের আত্ম-জাগরণ ও যুদ্ধযাত্রার সঙ্কল্পও বীররসেরই বানাবহ। —এর পর বারুণী-মুরলা-লক্ষ্মীর কথোপকথানদির শান্ত করুণ সামান্য স্তর পেরিয়ে প্রমোদ কাননে মেঘনাদের বীরোচিত উদ্দীপনা এবং লঙ্কায় এসে পিতার কাছে যুদ্ধযাত্রার যুদ্ধজয়ের অনুমতি প্রার্থনার (দুইবার আমি হারানু রাখবে /আর একবার পিতা, দেহ আজ্ঞা মোরে/ দেখিব এবার বীর বাঁচে কি ঔষধে।”) মধ্যে আবার বীররসের প্রবাহ। কাব্যের দ্বিতীয় সর্গে বীর রসের কথা নেই বললেই চলে। সেখানে বৈজয়ন্তধাম থেকে কৈলাস – যোগাসন- চূড়া—আকাশের অসীমতা পার হয়ে রামচন্দ্রের শিবিরে এসে পৌঁছেছে কাহিনী। তবে ‘মেঘনাদবধ’-এ ইন্দ্ৰ-মায়া-পার্বতী প্রভৃতি দেব-দেবীদের যে ভূমিকা, স্বর্গ-মর্তা জুড়ে যে উদ্যোগ ও সক্রিয়তা তা উদ্দীপনাময় বলেই মূলত ধীররসাত্মক। তৃতীয় মর্গ শুরু হয়েছে, প্রমীলার চোখের জলে। কিন্তু এ চোখের জল করুণ রসের উৎসার নয়, শৃঙ্গাররসের। সে কাঁদছে বিরহে। লঙ্কাপ্রবেশের সময় তার আচরণে ভাবনায় আবার দীপ্ত হয়ে উঠেছে বীররস (“দানবনন্দিনী আমি রক্ষকুল বধূ:/রাবণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী, / আমি কি ডরাই, সখি ভিখারী রাঘবে?/পশিব লঙ্কায় আজি নিজ ভুজবলে / দেখিব কেমনে মোরে নিবারে নুমণি।”)। নমুণ্ডমালিনী এবং অপরাপর চেড়ীদের যুদ্ধোন্মাদনার যে বীররসাত্মক বর্ণনা মধুসূদনের কলমে ফুটে উঠেছে এখানে তার বিকল্প উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে নেই। লঙ্কায় মেঘনাদের সঙ্গে প্রমীলার মিলনের পর কিম্বা রাম-বিভীষণদের আলোচনায় ঘটনাধারা বীররস থেকে সরে আসলেও সর্গের উপাঙ্কে কৈলাসে উমা-বিজয়ার কথোপকথনে আবার তা নবায়ত হয়েছে। কিন্তু পার্বতী যখন বলেছেন মম অংশে জন্ম ধরে প্রমীলা রূপসী,/ বিজয়ে হরিব তেজ: কালি তার আমি’ কিম্বা ‘অবশ্য লক্ষ্মণ শুর নাশিবে সংগ্রামে / মেঘনাদে।’ তখন আবার এসেছে করুণ রস এবং সেটা কৈলাসে প্রমীলার শিরানী সেবিকা হওয়া কিম্বা মেঘনাদের শিবসেবক হওয়ার কথায় তথা শাস্ত্র রসের সুবাতাসেও বিলোপিত হয়নি।

চতুর্থ সর্গের অঙ্গীরস শাস্ত। কিন্তু সীতাহরণের বর্ণনায়, রামের কথা বলতে গিয়ে দুঃখে বারাবার সীতার মূর্ছিত হওয়ার বর্ণনায়, জটায়ুর সঙ্গে রাবণের যুদ্ধের সময় সীতার বিপথে পালানোর বার্থ চেষ্টা ও হতচেতন হওয়ার বর্ণনায় করুণরসের ধারা অভিসিঞ্চিত হয়েছে এ সর্গে। তেননি জটায়ু কর্তৃক রাবণের পথরোধ ও যুদ্ধের হুঙ্কারে, কিম্বা যুদ্ধের যেটুকু কর্ণনা আছে তাতেও নিঃসৃত হয়েছে বীররস। সীতার স্বপ্নদর্শনে রামের বিজয়যাত্রা, লঙ্কাযুদ্ধ, কুম্ভকর্ণ-নিধন (‘প্রভু মোর, তীক্ষ্মতর শরে….. কাটিল তাহার শির:) বর্ণনায়ও বীররসের বাজনা। পঞ্চম সর্গের নাম ‘উদ্যোগ’। সততই বীররস প্রাধান্য পেয়েছে এই সর্গে। দেবী চামুণ্ডার মন্দির-দ্বারে লক্ষ্মণ কর্তৃক মহাদেবকে যুদ্ধে আহ্বানে (‘ধর্মে সাক্ষী মানি আমি আহ্বানি তোমারে । সত্য যদি ধৰ্ম্ম, তবে অবশ্য জিনিব।’), কিম্বা মায়ের অনুমতি নিতে মেঘনাদের নিবেদনে (‘পাশিব সমরে আজি নাশিব রাঘবে!” বা ও পদ-প্রসাদে চির-জয়ী দেব-দৈত্য- নরের সমরে / এ দাস।’) স্পষ্টতই বীররসাত্মক বানীবিন্যাস লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এখানেও মন্দোদরীর আশঙ্কা ব্যাকুলতা কিম্বা প্রমীলার আর্দ্র প্রার্থনায় উৎসারিত হয়েছে করুণ রসের ধারা।—ষষ্ঠ সর্গ লিখে মধুসূদন জানিয়েছিলেন ‘It costs me many a tear এবং সেটা মূলত মেঘনাদের মৃত্যু বর্ণনার জন্য। —

“হায় রে, অন্ধ অরিন্দম বলী ইন্দ্রজিৎ, খড়গাঘাতে পড়িলা ভূতলে শোনিতার্থ, থরথরি কাঁপিলা বসুধা

গর্জিলা উথলি সিন্ধু।”

মরণকালে মেঘনাদের আক্ষেপ, কিম্বা তার মৃত্যুর পর বিভীষণের দীর্ঘ হাহাকারেও করুণ- রসের ধারা দুর্বার। কিন্তু নিকুন্তিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণ ও মেঘনাদের বাগযুদ্ধ কিম্বা আত্মত্রাণে মেঘনাদের যুদ্ধনীতি কখন বা নিছক কোষার আঘাতেই লক্ষ্মণকে হতচেতন করার বর্ণনায় উদ্ভূত হয়েছে বীররস।—সপ্তম সর্গ শুরু হয়েছে মেঘনাদের মৃত্যু-জনিত কারুণ্য দিয়ে। প্রমীলার বাঁ চোখ নাচা, অলঙ্কারে গা ছড়ে যাওয়া, লঙ্কায় রোদনধ্বনি, কৈলাসে মহাদেবের বিষণ্ণতা, মেঘনাদের মৃত্যুর খবর শোনা মাত্র সিংহাসন থেকে রাবণের হতচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়া, সভাসদদের আর্তনাদ, শোকে ছিললতার মতো মন্দোদরীর লুটিয়ে পড়া ইত্যাদির বর্ণনায় আকুল হয়ে উঠেছে করুণ রসের ধারা। কিন্তু রাবণের যুদ্ধোদ্যোগ, রাম বাহিনীর প্রতিরোধ প্রস্তুতি, সুখীবের প্রতিজ্ঞা (মরিব, নহে মারিব, রাবণে,/ এ প্রতিজ্ঞা, শুরশ্রেষ্ঠ, তব পদতলে!), যুদ্ধযাত্রার পূর্বে সৈন্যদের উদ্দেশ্যে রাবণের ভাষণ (সমরে এবে পশি বিনাশিব/অধর্মী সৌমিত্রি মূঢ়ে, কপট সমরী,/ বৃথা যদি যত্ন আজি, আর না ফিরিব—/ পদাপণ আর নাহি করিব এ পুরে/ এ জন্মে। প্রতিজ্ঞা মম এই রক্ষোরথি।’), রাবণের ভয়ঙ্করতায় দেবতাদের উদ্বেগ, ইন্দ্রের নেতৃত্বে দেবসৈন্য, কার্তিক, অন্যদিকে রাবণের নেতৃত্বে অসিলোমা, বিড়ালাক্ষ, বাস্কল, উদগ্র প্রভৃতি সেনাপতি ও দুষ্কর্য সৈন্যের আর রামের নেতৃত্বে তাঁর সৈন্যদের ভয়ঙ্কর সংগ্রামের বর্ণনা, অবশেষে লক্ষ্মণ ও রাবণের তুমুল লড়াইয়ের বর্ণনায় বীররস এখানে তুঙ্গ পর্যায়ে উন্নীত। কিন্তু মেঘনাদের মৃত্যু-শোক দিয়ে শুরু এ সর্গের পরিণতি লক্ষ্মণের মৃত্যুতে এবং ‘পরাভূত যুদ্ধে, মহা অভিমানে সুরদলে সুরপতি গেলা সুরপুরে।’— এই শোকের আবহ নিয়ে শুরু অষ্টম সর্গের। ভ্রাতৃশোকে রাম ও তাঁর সহায়কেরা শোক-নিথর। এ সর্গে ঘটনা-পটভূমি মর্ত্য থেকে পৌঁছেছে নরকে। সেখানে পাপী-তাপীদের ভয়ঙ্কর শাস্তি ও তাদের আর্তনাদে করুণ রসের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে বারে বারে। বিস্ময় এবং ওপারও অবতারণা করা হয়েছে এই সর্গে। তবে বীররস এ সর্গে অনুপস্থিত। —

কাব্যের অস্তিম তথা নবম সর্গের নাম ‘সংকিয়া’। মেঘনাদের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়াই এ সর্গের বর্ণিতব্য বিষয়। এই অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার জন্য রাবণের অনুরোধে প্রতিপক্ষ রান তাঁর প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে কথা দিয়েছেন, না ধরিব অস্ত্র সপ্ত দিন আমি সসৈন্যে।’ সততই এরপর এ সর্গে বীররসের কোনো অবকাশই ছিল না। পুত্রহারা পিতার সান্ত্বনাহীন হাহাকার, স্বামীহারা, প্রিয়তমার সহগমন মূর্খ, রাজ্যের আপামর প্রজাবুলের কান্না—এমন কি রক্ষোবুলের দুঃখে সীতারও অশ্রুপাতে এ সর্গ যেন করুণ রসের পারাবার। কবির অমিত্রাক্ষর-বীণাও যেন বেহাগের লিরিকে বাঁধা

“ছিল আশা, মেঘনাদ, মুদির অধিমে এ নয়নময় আমি তোমার সম্মুখে সঁপি রাজ্যভার পুত্র, তোমায়, করিব মহাযাত্রা। কিন্তু বিধি বুঝিব কেমনে তাঁর নীলা। তাড়াইলা সে সুখ আমারে!’

আগেই বলেছি, কবির নিজের ব্যক্তি জীবনের সঙ্গে এ কাব্যের করুণরসের কোনো সংস্রব নেই। এ কাব্য আখ্যানকাব্য। সাহিত্যধর্মে এ বস্তলীন। এ কাব্যের রসপরিণতির অনিবার্যতা এর আখ্যানের মধ্যেই নিহিত। মেঘনাদের মৃত্যু-জনিত রাবণের চিতাভিঘাত, থেকেই উৎসারিত হয়েছে এ কাব্যের বেদনা-বিধুর রসপরিণতি এবং এই পরিণতিকে আবেদনে সুগভীর ও অপরিমেয় করে তুলেছে প্রতিপক্ষ রাম-সীতা বিভীষণ—এমন কি মহাদেবেরও চিত্তবৈকল্য। বন্ধু রাজনারায়ণকে একটা চিঠিতে মধুসূদন লিখিলেন, ‘You must not, my dear fellow, judge the work as a regular ‘Heroic Poem’, I never meant as such. It is a story, a tale, rather heroically told. Do not be frightened my dear fellow, I won’t trouble my reader with Viraras’ (বীররস)।” চিঠিটি পড়ে মনে হয় বন্ধু যেন কিছু একটা আপত্তি তুলেছিলেন এ কাব্যের বীররস সম্পর্কে। সেই আপত্তিরই উত্তর দিয়েছেন মধুসূদন। কাব্যের করুণ রসের প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি নিজেই ‘I can tell you that you have to shed many a tear for the glorious Rakhasas, for poor Lakshana, for Promila. I never thought, I was such a fellow for the pathetic, ” —তাঁর এই সব উক্তিতেই স্পষ্ট, যে অঙ্গীকার তিনি উপক্রমণিকায় করেছিলেন কাব্য রচনায় এগিয়ে তার প্রতি তিনি প্রতিবদ্ধ থাকেন নি। আখ্যানের নিজস্ব টানই তাঁকে তা থাকতে দেয় নি।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Sean silla language services. Lenard’s terror strikes is a fictional story with fictional characters.