‘সংগতি’ কবিতার ভাববস্তু বিশ্লেষণ করো।   অথবা       ‘সংগতি’ কবিতায় অমিয় চক্রবর্তী যে আশাবাদের কথা ব্যক্ত করেছেন, তা আলোচনা করো।   অথবা     ‘সংগতি’ কবিতায় কবি মানবজীবনকে এক মহান ঐক্যসূত্রে বাঁধতে চেয়েছেন, আলোচনা করো।       অথবা     ‘সংগতি’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।   অথবা ‘সংগতি’ কবিতায় কবি কিভাবে জগতের যাবতীয় অসংগতির মধ্যে সংগতি বিধান করতে চেয়েছেন, আলোচনা করো।   

অমিয় চক্রবর্তীর লেখা একটি বিখ্যাত কবিতা ‘সংগতি’। কবিতাটি ১৯৩৩ সালে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৪৩ সালে কবিতাটি ‘অভিজ্ঞান-বসন্ত’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ‘সংগতি’ কবিতায় দৃশ্যমান এই জড়জগতের যাবতীয় অসংগতি বা সামঞ্জস্যহীনতায় ব্যথিত হয়ে কবি শেষপর্যন্ত এই আশা পোষণ করেছেন যে, পরমকল্যাণময় এক শুভশক্তির ইচ্ছায় শেষ পর্যন্ত সবকিছুই সংগতি লাভ করবে।

সমাজিক জাতিবৈষম্য, ধর্মভেদ, সাম্প্রদায়িকতা, অস্পৃশ্যতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রভৃতি অশুভ শক্তিগুলি মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধ সৃষ্টি করে। এক শুভ শক্তির আগমনে একদিন সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশ হয়ে এই বিশ্ব- সংসার মহামানবের মিলনভূমিতে পরিণত হবে। এই আশাবাদী মানসিকতাই কবিতার মূলসুর।

কবিতার শুরুতেই রয়েছে ঝড়ো হাওয়ায় ভেঙে পড়া পোড়ো বাড়ির দরজার প্রসঙ্গ-

“মেলাবেন তিনি ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়িটার ঐ ভাঙ্গা দরজাটা।

মেলাবেন।”

‘ঝড়ো হাওয়া’ এখানে আধুনিক জীবনযাত্রার প্রতীক, আর ‘পোড়ো বাড়ি’ আশ্রয়হীনতার চিহ্ন বহন করছে। আধুনিক জীবনযাত্রা মানুষকে মানবিকতা থেকে আশ্রয়চ্যুত করেছে। তৈরি হয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধ। প্রকৃতি জগতেও তৈরি হয়েছে নানান অসংগতি। একদিকে খরা, অন্যদিকে বন্যায় জনজীবন বিধ্বস্ত হয়ে উঠে। কবি লিখেছেন-

“আকাশে আগুনে তৃষ্ণার মাঠ ফাটা

মারী-কুকুরের জিভ দিয়ে খেত চাটা-

বন্যার জল, তবু ঝরে জল,

প্রলয় কাঁদনে ভাসে ধরাতল-“

অর্থাৎ প্রচণ্ড খরায় তপ্ত মাঠের উপর তৃষ্ণার্ত মানুষের হাহাকার যেন ব্যাধিগ্রস্ত মৃত্যুপথযাত্রী কুকুরের এক ফোঁটা জলের জন্য জিভ দিয়ে মাটি চাটার সমতুল্য। আবার এর বিপরীত দিকটিও কবির দৃষ্টি এড়ায়নি। খরার কবল থেকে মুক্তি পেতে বন্যা কখনোই কাম্য নয়। তবে তিনি বিশ্বাস করেন। একদিন কোনো এক শুভ শক্তি এই দুই বিপরীত অবস্থার মধ্যে সংগতি বিধান করবেন।

অসংগতি শুধু প্রকৃতি জগতেই নয়, দেশ-কাল সমাজেও রয়েছে নানান অসংগতি- আদর্শগত দিক থেকে অসংগতি, অর্থনৈতিক দিক থেকে অসংগতি, শ্রেণীগত দিক থেকে অসংগতি। কবি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন এই সমস্ত অসংগতির একদিন অবসান ঘটবে-

“জীবন, জীবন-মোহ,

ভাষাহারা বুকে স্বপ্নের বিদ্রোহ-

মেলাবেন, তিনি মেলাবেন।”

দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্ব পরিক্রমার সূত্রে কবি দেখেছিলেন ছিন্নমূল মানবাত্মার অসহায়তা। ‘সঙ্গী হারানো পাখি’-র উপমায় কবি মানুষের নিদারুণ একাকীত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তারপরেই বলেছেন—

“প্রাণ নেই, তবু জীবনেতে বেঁচে থাকা।”

অর্থাৎ, ছিন্নমূল মানুষ অর্থহীনভাবে বেঁচে থাকে। এ যেন মানব সভ্যতার

অস্বিত্বের চূড়ান্ত সংকট। তবে এই সংকটকেই জীবনের শেষ সত্য বলে মেনে নেননি কবি। তাঁর কাছে জীবন নিষ্ফল নয়। এক চূড়ান্ত আশাবাদ থেকেই কবি লিখেছেন-

“তোমার সৃষ্টি, আমার সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্টির মাঝে

যত কিছু সুর, যা-কিছু বেসুরো বাজে

মেলাবেন।”কবিতার শেষাংশে কবি সমাজজীবনে অর্থনৈতিক অসাম্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন-

“মোটর গাড়ির চাকায় ওড়ায় ধুলো, যারা সরে যায় তারা শুধু- লোকগুলো;”

যারা মোটরগাড়ি চড়ে তারা তো ধনী শ্রেণীর মানুষ। তারা কখনো তাদের মোটরের চাকার ধুলোয় ধূসরিত পথের দু’পাশের সাধারণ মানুষের দিকে ফিরে চায় না। ধনী-দরিদ্রের এই অসংগতি দুরীকরণের জন্য কবি আস্থা রেখেছেন এক সর্বব্যাপী শুভ শক্তির উপর। তিনি বিশ্বনিয়ন্ত্রা এক শুভশক্তিতে বিশ্বাস রেখেছিলেন। আর বিশ্বাস রেখেছিলেন বলেই, আলোচা কবিতায় তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ে বলতে পেরেছেন মানবসমাজের যাবতীয় বিচ্ছিন্নতা, অসংগতি এক দিন দূরীভূত হয়ে যাবে এবং মানবজীবন এক মহান ঐক্যসূত্রে বাঁধা পড়বে। কবির এই আশাবাদই কবিতার মূল ভাববস্তু। কবি তাই পুনরায় ‘ঝোড়ো হাওয়া’ আর ‘পোড়ো দরজা’র প্রসঙ্গ টেনে দৃঢ় অঙ্গীকারে কবিতার সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন-

“ঝোড়ো হাওয়া আর ঐ পোড়ো দরজাটা

মেলাবেন তিনি, মেলাবেন।”

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Social and preventive pharmacy 8th semester notes pdf download. Hammers dm developments north west. Proliferation of small arms and ethnic conflicts in nigeria : implication for national security.