‘শাশ্বতী’ কবিতাটির বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করো।   অথবা        ‘শাশ্বতী’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।   অথবা        ‘শাশ্বতী’ কবিতাটি অবলম্বনে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রেম ভাবনার পরিচয় দাও।   অথবা             ‘শাশ্বতী’ কবিতা থেকে যে কোনো প্রশ্ন আসলেই এই উত্তরটা লেখা যাবে।

সুধীন্দ্রনাথ দত্ত রচিত একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো ‘শাশ্বতী’। কবিতাটি ১৯৩১ সালের ২৭শে আগস্ট রচিত হয় এবং ১৯৩৩ সালে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে কবিতাটি ‘অর্কেস্টা’ (১৯৩৫) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়।

‘শাশ্বতী’ একটি অসাধারণ প্রেমের কবিতা। তবে প্রেমিকা নয়, প্রেমের শাশ্বত বা চিরন্তন রূপকেই কবি এখানে গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রেমের চিরন্তন রূপের কথা রবীন্দ্রনাথও স্বীকার করে নিয়েছেন। সার্থক প্রেম প্রেমিককে চিরঋণী করে রেখেছে। আর প্রেমিক সেই ঋণ পরিশোধের প্রত্যাশায় স্মৃতির জগতে প্রতিষ্ঠিত করে এক ‘শাশ্বতী’ প্রেমিকার মূর্তি। তাই প্রেমিকা নয়, প্রেমই চিরন্তন।

তিনটি স্তবকে বিন্যাস্ত ‘শাশ্বতী’ কবিতার প্রথম স্তবকে প্রকৃতির নানা অনুসঙ্গের প্রেক্ষাপটে কবি-হৃদয়ের আবেগঘন মুহূর্তের ছবি আঁকা হয়েছে। বর্ষার বিদায়ে আকাশে-বাতাসে শরতের ছোঁয়া লেগেছে। কবির লিখেছেন-

“মাঠে, ঘাটে, বাটে আরব্ধ আগমনী।”

আগমনীর মিলন উৎসবে কবির মনেও প্রিয় মিলনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। দীর্ঘ বিরহের সময় অতিক্রান্ত হয়ে শিউলি ফুলের দলিত শয্যায় উভয়ের মিলন ঘটে। জীবনে আসে নবান্নের উৎসব। এসবই কবির উপলব্ধি। প্রকৃত বাস্তবতা হলো-

“পশ্চাতে চায় আমারই উদাস আঁখি; একবেণী হিয়া ছাড়ে না মলিন কাঁথা।”

প্রকৃতির নানা অনুসঙ্গে কবির ভাবনায় উঠে এসেছে বিগত প্রেমের স্মৃতি। এই প্রেম যেমন মিলনের আনন্দে পরিপূর্ণ, তেমনি বিরহের যন্ত্রণায় কাতর। ‘উদাস আঁথি’ এবং ‘মলিন কাঁথা’ শব্দদুটি প্রিয় মিলনের ব্যর্থতাকেই প্রকাশ করেছে।

সুধীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবন থেকে জানা যায়, ১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী হয়ে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানে যান। সেখানে জার্মান ভ্রমণকালে রাইন নদীর তীরবর্তী কোনো এক শহরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই সময় এক বিদেশিনীর সেবায় তিনি রোগমুক্ত হয়েছিলেন এবং তার প্রতি মানসিকভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। হয়তো সেই প্রেম ছিল একতরফা, কিন্তু কবি কখনোই তা অস্বীকার করেননি। ‘শাশ্বতী’ কবিতার

দ্বিতীয় স্তবকে কবি তাঁর জীবনে সেই বিদেশিনীর উপস্থিতিকে ব্যক্ত করতে গিয়ে লিখেছেন-

“সে এসে সহসা হাত রেখেছিলো হাতে, চেয়েছিলো মুখে সহজিয়া অনুরাগে।”

বিদেশিনীর সোনালী চুলের সঙ্গে কবি পাকা ধানের তুলনা করেছেন। কবির মনে হয়েছে বিদেশিনীর সঙ্গে তাঁর সাত জন্মের আগের পরিচয়, তবুও তার লজ্জাবনত দৃষ্টিকে কবি ভুলতে পারেননি। বিদেশিনীর লজ্জাবনত দৃষ্টিতে কবি সাতটি স্বর্গের আনন্দ লাভ করেছিল। মুহুর্তে রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল কালের চিরচঞ্চল গতি। আসলে প্রেম আলোছায়ার মতো ক্ষণস্থায়ী হলেও তার বেদনা চিরকালের।

কবিতার তৃতীয় স্তবকে কবি তাঁর ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতি স্মরণ করে বলেছেন-

“সন্ধিলগ্ন ফিরেছে সগৌরবে; অধরা আবার ডাকে সুধাসংকেতে।”

কবির স্মৃতিতে বারবার ফিরে এসেছে হারিয়ে যাওয়া সেই প্রেমের প্রসঙ্গ। প্রকৃতির মাঝে তিনি অনুভব করেছেন চিরন্তন প্রেমের স্পর্শ। তিনি মনে করেন, প্রেম ভরা নদীর মতো আবেগে পূর্ণ। প্রকৃতির মাঝে প্রেম আছে, থাকবে। কেবল তার সঙ্গীটি বদলে যায় মাত্র-

“পুনরাবৃত্ত রসনায় প্রিয়তম;

কিন্তু সে আজ আর কারে ভালোবাসে।”

কিন্তু কবি প্রেমের সেই পূর্বস্মৃতিকে সযত্নে সঞ্চিত করে রেখেছেন। কবিতার শেষে কবি দৃঢ় কন্ঠে ঘোষণা করেছেন-

“সে ভুলে ভুলুক, কোটি মন্বন্তরে আমি ভুলিব না, আমি কভু ভুলিব না।”

প্রেমের এই চিরন্তন রূপই ‘শাশ্বতী’ কবিতার মূল সুর। কোটি মন্বন্তরের মধ্যেও প্রেমিকাকে, প্রেমের স্মৃতিকে না ভোলার অঙ্গীকারের মধ্যেই কবির শাশ্বত প্রেমভাবনা প্রকাশিত হয়েছে এবং কবিতার নামকরণ সার্থক হয়েছে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Lates education news. Garden rooms & out buildings dm developments north west. Yangzhou university scholarships 2024.