শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের পার্থনা’ কবিতাটির ভাববস্তু বিশ্লেষণ করো।   অথবা  ‘বাবরের প্রার্থনা’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। অথবা   ‘বাবরের প্রার্থনা’ কবিতাটির প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বিষয়বস্তু আলোচনা করো।  অথবা  ‘বাবরের প্রার্থনা’ কবিতাটি ইতিহাসের কাহিনির পটভূমিতে কবির সমকালীন যুগের জীবন-ভাষ্য- আলোচনা করো।

শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’ কবিতাটি ‘বাবরের প্রার্থনা’ (১৯৭৬)কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। ‘বাবরের প্রার্থনা’ কবিতাটির রচনাকাল ১৯৭৪ সাল। ১৯৭৭ সালে ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য শঙ্খ ঘোষ সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। ১৯৭৪ সাল বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক দুঃস্বপ্নের কাল। সারাদেশ জরুরি অবস্থা, চারিদিকে দম বন্ধ করা এক পরিস্থিতি, তরুণ যুবসমাজ দিশাহারা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গুপ্তহত্যা, হিংসা- গোটা সমাজটাই দিশাহারা হয়ে উঠেছিল। এরকম এক প্রেক্ষাপটে কবি ব্যক্তিগত দুঃখের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৪ সালে হেমন্তের এক সন্ধ্যায় আকস্মিকভাবেই রচনা করেছেন ‘বাবরের প্রার্থনা’ কবিতাটি।

‘কবিতার মুহূর্ত’ নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে কবির বড় মেয়ে বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। ডাক্তারেরা রোগনির্ণয় করতে না পারায় দিনে-দিনে তার রোগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং মিলিয়ে গিয়েছিল তার লাবণ্য। অথচ সেই কিশোরী মেয়েটির তখন আনন্দে বেড়ে ওঠার বয়স। তাই কবির মন খুবই বিষণ্ণ ছিল এবং কোনো কাজে মনোনিবেশ করতে পারছিলেন না। সেরকম এক সন্ধ্যার প্রাক্কালে নির্জন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পদচারণা করতে করতে কবির হঠাৎ মনে হয়েছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনার কথা। মুঘল সম্রাট বাবরের পুত্র হুমায়ূন একবার প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছুতেই হুমায়ূন সুস্থ হচ্ছেন না দেখে বাবর একদিন নতজানু হয়ে পুত্র হুমায়ূনের আরোগ্য কামনা করে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন ঈশ্বরের কাছে। তারপর ধীরে ধীরে হুমায়ূন সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু বাবর আর বেশিদিন বাঁচেননি। এই ঐতিহাসিক তথ্যটিকেই শঙ্খ ঘোষ সম্পূর্ণ নতুনভাবে রূপদান করেছেন আলোচ্য কবিতাটিতে।

পিতার প্রার্থনা ও গুরুজনদের আশীর্বাদে কোনো সন্তান বা সন্তানসম প্রিয়জনদের রোগমুক্তি ঘটা সম্ভব কিনা সে বিতর্কে না গিয়েই বলা যায়, মানুষের মঙ্গল কামনায়, সত্যনিষ্ঠায়, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় যে মনের জোর সৃষ্টি হয়, সেই মনের জোরেই মানুষ কখনো কখনো অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে। মহাপুরুষদের জীবনী পাঠ করতে গিয়ে এরূপ অনেক ঘটনার সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়ে থাকি, যেগুলিকে অলৌকিক ঘটনা না বলে শুধু বিশ্বাসের দ্বারাই অসাধ্যকে সাধন করেছেন বলে ভাবা যেতে পারে। যেমন, মাদার টেরেসার অলৌকিক শক্তির কথা খ্রিস্টানরা সারা বিশ্বের সামনে স্বীকার করে নিয়েছেন। কিছু বাস্তব ঘটনা ও কিছু বিশ্বাস মিলেই তৈরি হয় এই মিথগুলি। হুমায়ূনের জন্য বাবরের ঐকান্তিক প্রার্থনার সত্যটিকে ঘিরেও গড়ে উঠেছে এই বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়েই কবি শঙ্খ ঘোষ পরম শক্তিমান ঈশ্বরের কাছে নিজের কন্যার রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা জানিয়েছেন।

কবিতাটির বিশেষত্ব হলো, এখানে কবির তথা ব্যক্তি মানুষের প্রার্থনা সারা পৃথিবীর অসুস্থ মানুষের রোগ মুক্তির প্রার্থনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ভারতবর্ষ জুড়ে অশান্তি, মূল্যহীন প্রাণ, প্রতিনিয়ত বিনা অপরাধে প্রাণ দিচ্ছে শত শত তরুণ যুবক, প্রতিদিন পুলিশের গুলিতে বা ঘাতকের ছুরিতে রক্তে ভেসে যাচ্ছে দেশের মাটি। এমতাবস্থায় কবির মনে হয়েছে, দেশের যুবসমাজ অসুস্থ বাবরের পুত্রের মতোই মৃত্যুর প্রহর গুনে চলেছে। তাই শুধু কবির নয়, যেকোনো পিতার যেকোনো পুত্রই যেন আজ রোগশয্যায়। কবি একজন স্নেহময় পিতারূপে তাদের সকলের রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা জানিয়েছেন। তিনি প্রার্থনা জানিয়েছেন, নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও সেইসকল যুবকদের জীবন লাভ ঘটুক, তারা আনন্দ-উৎসবে জীবন অতিবাহিত করুক-

“এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম আজ বসন্তের শূন্য হাত-

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।”

শত-সহস্র তরুণ-তরুনীর জন্য কবির হৃদয় কাতর হয়ে উঠেছিল। শত-শত ছাত্রদের শুষ্ক মুখের দৃশ্য কবিকে উদ্বিগ্ন করেছিল। কবির অনুভূতিশীল মন দেশের যুবসমাজের কষ্টকে ভুলতে পারেনি বলেই নিজের কন্যার কথা ভাবতে ভাবতে তাঁর মনে পড়েছে সম্রাট বাবরের প্রার্থনার কথা।

দেশের যুবসমাজের যন্ত্রণা ও আবেগ কবি শঙ্খ ঘোষকে স্পর্শ করেছে। তাঁর মনে হয়েছে এই যুবসমাজ যে আজ দিশাহারা, অসুস্থ, মৃত্যুর মুখোমুখি, তার জন্য তাদের কোনো দায় নেই। তারা যেন পিতার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে। সভ্যতা ও বিজ্ঞানের অগ্রগতি ক্রমশ নারকীয় গতিতে ধ্বংস করে দিয়েছিল মানুষের জীবনকে। দুর্নীতি, পাপ, অন্যায় ও শঠতায় ছেয়ে গিয়েছিল সমগ্র দেশ। সকলের মধ্যে শুভবুদ্ধির জাগরন না ঘটলে এই যুবসমাজ কি করে মুক্তি পাবে? তাই কবি লিখেছেন-

“না কি এ শরীরের পাপের বীজাণুতে

কোনোই ত্রাণ নেই ভবিষ্যের? আমারই বর্বর জয়ের উল্লাসে মৃত্যু ডেকে আনি নিজের ঘরে?”

মানুষকে নতজানু হয়ে প্রার্থনায় বসতে হবে, পাপ, হিংসা, লোভকে জয় করে সকলের মধ্যে শুভবুদ্ধির চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। নাহলে সময় ও পরিস্থিতির চাপে একদিন এই বর্বর আগুনে পুড়ে সব ধ্বংস হয়ে যাবে। অথচ কোনো পিতা, কোনো বিবেকবান মানুষ তা কখনোই চান না। তাই কবিতাটির শেষ স্তবকে কবি নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছেন এবং নিজের মৃত্যুর বিনিময়ে হলেও সন্তানকে রক্ষা করতে চেয়েছেন-

“ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।”

শঙ্খ ঘোষ ছিলেন সমাজ-সচেতন ও ইতিহাস-সচেতন কবি। তিনি ইতিহাসের কাহিনির পটভূমিতে সমকালীন সমাজ ও যুগমানসিকতার এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন কবিতাটিতে। পুত্রের মঙ্গল কামনায় বাবরের প্রার্থনা এখানে সমগ্র মানবজাতির মঙ্গল কামনার রূপক হয়ে উঠেছে। এখানেই কবিতাটির সার্থকতা এবং নামকরণ সার্থক।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Novel drug delivery systems 7th semester notes pdf download. Hmo refurb dm developments north west. Yangzhou university scholarships 2024.