শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘অবনী বাড়ি আছো’ কবিতাটির ভাববস্তু বিশ্লেষণ করো।  অথবা  ‘অবনী বাড়ি আছো’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।  অথবা  ‘অবনী বাড়ি আছো’ কবিতা অবলম্বনে কবির অস্তিত্বের সংকটের পরিচয় দাও।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও আলোচিত কবিতা ‘অবনী বাড়ি আছো’। কবিতাটি ‘ধর্মে আছো জিরাফেও আছো’ (১৯৬৫) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত। তিনটি স্তবকে বিন্যস্ত এই কবিতার প্রতিটি স্তবকের শেষেই ব্যবহৃত হয়েছে একটি প্রশ্নবাক্য- “অবনী বাড়ি আছো?” এই প্রশ্নবাক্যটি কবিতার মূল অবলম্বন। এই প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে কবিতার বক্তব্য ও ব্যঞ্জনা।

গভীর রাতে দরজা বন্ধ করে সমস্ত পাড়া যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন, তখন কবি শুনতে পান, আশেপাশের কোনো এক বাড়িতে কড়া নেড়ে কেউ জানতে চাইছে, অবনী বাড়ি আছে কিনা-

“দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া

কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া

‘অবনী বাড়ি আছো?”

রাতটি ছিল প্রচণ্ড বর্ষণমুখর। তবে শুধু সেই রাত নয়, কবির কথায় সেখানে বারোমাসই বৃষ্টি হয় এবং মেঘ গাভীর মতো বিচরণ করে। অযত্নে লালিত বড় বড় নালি ঘাস দরজার পথে বাধা সৃষ্টি করে। তবুও সেই বাধা অতিক্রম করে দরজার কড়া নেড়ে কেউ জানতে চায়, অবনী বাড়ি আছে কিনা-

“বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে

পরাম্মুখ সবুজ নালিঘাস

দুয়ার চেপে ধরে-

‘অবনী বাড়ি আছো?”

আত্মমগ্ন কবি ব্যথাহত হৃদয় নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সহসা কড়া নাড়ার শব্দে জেগে উঠে পুনরায় শুনতে পান- “অবনী বাড়ি আছো?”

বর্ষণমুখর অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত্রি, ঘুমে ঢলে পড়া পাড়া, অযত্ন লালিত নালি ঘাস এবং রাতের কড়া নাড়া কবিতাটির মধ্যে এক অলৌকিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। পাশ্চাত্য কবি ডিলা মেয়ারের ‘লিসনার্স’ কবিতায় বারবার বারবার ধ্বনিত হয়েছে- “Is there anybody here.”

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও তেমনি কবিতার মধ্যে বারবার জানতে চেয়েছেন- “অবনী বাড়ি আছো?”

তবে মেয়ারের কবিতায় যে ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে, তা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় নেই। তবে রহস্যপূর্ণ এক অনুভূতির জগতকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

অন্ধকার রাত্রিতে বারবার উচ্চারিত হয়েছে- “অবনী বাড়ি আছো?” কে এই অবনী? কে এবং কেন অবনীর খোঁজ করেছে? কবি এখানে অবনী কিংবা অবনীর খোঁজে আসা ব্যক্তির কোনো পরিচয় দেননি।

‘অবনী’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘পৃথিবী’। তবে এখানে ‘অবনী’ বলতে কবি নিজেকেই নির্দেশ করেছেন। আর অবনীর খোঁজে আসা ব্যক্তি হলো কবির অন্তরাত্মা। অন্ধকার রাত, বৃষ্টি, নালি ঘাসের মধ্য দিয়ে কবি সমাজের নানা জটিলতার দিকগুলিকে তুলে ধরেছেন। মানুষমাত্রেই সমাজের জটিল ঘূর্ণাবর্তে আবদ্ধ অসহায় এক পথিক। তবুও সবকিছু উপেক্ষা করে আমরা দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকতে চাই। কিন্তু অন্তরসত্তা কখনো কখনো আমাদের সজাগ করে দেয়। ‘কড়ানাড়া’ আসলে আমাদের সজাগ করারই একটা প্রচেষ্টা। আগন্তুক ব্যক্তি আসলে আমাদের অন্তরে সদাজাগ্রত এক দ্বিতীয়সত্তা, যে সময়মতো সচেতন করে দিয়ে সকল বিপদের হাত থেকে আমাদের উদ্ধার করতে চায়।

আবার, ব্যক্তিমানুষ সবসময় স্থূল বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। অন্তরাত্মা সেই স্থূল বিষয়ের হাত থেকে আমাদের উদ্ধার করে সূক্ষ্ম অনুভূতির দিকে নিয়ে যায়। তাই ‘অবনী বাড়ি আছো?’ প্রশ্নবাক্যটি সর্বদা আমাদের হৃদয়কে জাগ্রত করে রাখে। এখানেই কবিতাটির সার্থকতা এবং নামকরণ সার্থক।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Computer architecture questions asked in previous year competitive exams archives compitative exams mcq questions and answers. Electrical dm developments north west. Pharmaceutical engineering 1 3rd semester notes pdf download my first study.