বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনতত্ত্ব হলেও চর্যাগীতিতে বাস্তব সমাজ জীবনের পরিচয় মুদ্রিত। – আলোচনা করো

বাঙালিমাত্রই চর্যাপদ নামটির সঙ্গে পরিচিত। বিষয়বস্তুর সঙ্গেও অল্পবিস্তর। এই চর্যাপদ তথা চর্যাগীতি, তার রচনাকার, রচনাকাল, লিপি, ভাষা, ছন্দ, সুর, বিষয়বস্তু, বহিরঙ্গের অর্থ, অন্তরঙ্গের অর্থ, বৌদ্ধ সাধন তত্ত্ব, দর্শন, কাব্যরস, সমাজজীবন – সবকিছু নিয়ে একটি জটিল বিষয়। এর সবকটি দিককে লেখায় আনা আমার সাধ্যাতীত। আমি চর্যাপদে উল্লিখিত সমাজচিত্র (তা রূপক অর্থে ব্যবহৃত হলেও) সম্পর্কে কিছু আলোচনার চেষ্টা করবো মাত্র।তবে, কোনো গ্ৰন্থকে বুঝতে হলে, তার সম্পর্কে কিছু মৌলিক তথ্যও জানা আবশ্যক। যেমন –

প্রাপ্তি ও প্রকাশ

উনিশ শতকের শেষ ভাগে রাজেন্দ্রলাল মিত্র নেপাল ভ্রমণ করে সংস্কৃত ভাষায় রচিত কিছু পুথি উদ্ধার করেন এবং ‘Sanskrit Buddhist literature in Nepal‘ নামক এক পুস্তিকায় তার একটি তালিকা প্রকাশ করেন (১৮৮২ সাধারণাব্দ)। তাঁর মৃত্যুর পর পুথি সংগ্রহের দায়িত্বভার অর্পিত হয় মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর উপরে।তিনি তিনবার নেপালে যান।  প্রথমবারের অভিজ্ঞতার ফসল তাঁর লেখা ‘Discovery of living Buddhism in Bengal‘ গ্রন্থটি। পরের দুইবারের যেসব পুথি সংগ্রহ করেন সেগুলি হল– ডাকার্ণব, সুভাষিতসংগ্ৰহ, দোহাকোষপঞ্জিকা ও চর্যাপদের পুথি। ১৯১৬ সাধারণাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ‘হাজার বছরের পুরনো বাংলা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা’ প্রকাশ করেন, যার মধ্যে চর্যাপদও ছিল।

নামকরণ

চর্যাপদের ভাষার বিতর্ক শুরু হয় এর নামকরণ থেকেই। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পুথিটি খন্ডিত আকারে পান। মুদ্রণের সময়ে তিনি এর নামকরণ করেন চর্যাচর্যবিনিশ্চয়। অনেকে মনে করেন পুথির প্রথমে “শ্রীলূয়ীচরণাসিদ্ধিরচিতেঽপ্যাশ্চর্যচর্যাচয়ে” এই বাক্যবন্ধে যে আশ্চর্যচর্যাচয় কথাটি আছে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রদত্ত নামটি তার থেকেই সৃষ্টি। এই জন্য বিধুশেখর শাস্ত্রী মত দেন, পুথির নাম হওয়া উচিত ‘আশ্চর্যচর্যাচয়’। অন্যদিকে প্রবোধচন্দ্র বাগচী মহাশয় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সঙ্গে একমত না হয়েও আশ্চর্য কথাটি রক্ষার পক্ষপাতী হন ও নাম দেন ‘চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়’। তবে শেষ পর্যন্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রদত্ত ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ নামেই ওই পুথি খ্যাত হয়। তাছাড়া গান/ পদগুলিকে বহু স্থানে চর্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বিনিশ্চয় কথাটিও তান্ত্রিক বৌদ্ধ ঐতিহ্যে পরিচিত (যেমন প্রজ্ঞোপায়বিনিশ্চয়সিদ্ধি)।

ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় আরেক ভাবেও নামটির অর্থ কি ব্যঞ্জনা দিয়েছেন– “যে গ্রন্থ আচরণীয় ও অনাচরণীয় তত্ত্বসমূহকে বিশেষ রূপে নিশ্চয় করিয়া দেয় –তাহাই চর্যাচর্যবিনিশ্চয়”। তবে সাধারণভাবে আমরা চর্যাপদ, চর্যাগীতি এই নামগুলোও ব্যবহার করে থাকি।

রচনাকাল ও রচয়িতা

এই দুটি বিষয় পরস্পর সংযুক্ত। কারণ চর্যার কবিদের জীবৎকাল ধরে এই হিসাব বার করা সম্ভব। সেক্ষেত্রেও আবার প্রথম ও শেষ রচয়িতার জীবনকাল নির্ণয় জরুরী। এই রচয়িতাদের বলা হত সিদ্ধাচার্য। তিব্বতি মত অনুযায়ী এঁদের সংখ্যা চুরাশি জন (চৌরাশ সিদ্ধা)। এঁদের মধ্যে আবার (ভণিতা অংশ পাঠ করে), মনে হয় পদ লিখেছেন তেইশ জন। যদিও টিকা ও মূলপদে নামের পার্থক্য, শব্দার্থের বিভিন্নতা, (যেমন ১৭ নং পদের পদকর্তার নাম বীণাপাদ। কিন্তু এটি বাস্তবেই ব্যক্তিনাম কিনা সন্দেহ আছে) ইত্যাদি অসুবিধা রয়েই গেছে। এই তেইশজন হলেন — লুই, কুকুরী, বিরুয়া, গুডরী, চাটিল, ভুসুক, কাহ্ন/কাহ্নু, কামলি, ডোম্বী, শান্তি, মহিন্ডা, বীণা, সরহ, শবর, আজদেব, ঢেণ্ঢণপা, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম ও তন্ত্রী। এঁদের মধ্যে তো বটেই, ওই চুরাশি সিদ্ধাচার্য মধ্যেও লুই হলেন আদি সিদ্ধাচার্য। (রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে অবশ্য সরহ)। লুই দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের চাইতে সামান্য বেশিবয়স্ক। এঁদের মিলিত রচনাটির নাম ‘অভিসময়বিভঙ্গ’। দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান 1038CE তে আটান্ন বছর বয়সে তিব্বত যাত্রা করেন এই সূত্র ধরে সুনীতিকুমার সিদ্ধান্ত করেছেন, ” The literary life of Lui, when he composed these songs, can vary well be placed in the second half of the 10th century..”. এটি চর্যার রচনাকালের উর্ধ্বসীমা। আবার নাথসাহিত্য, গোরক্ষনাথ ও তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্য, হেবজ্রপঞ্জিকা রত্নমালা গ্ৰন্থের সাক্ষ্য, ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ– ইত্যাদি জটিল পথ ধরে কাহ্নপাদের সময়কালকে (হেবজ্রপঞ্জিকার প্রণেতা পন্ডিতাচার্য কৃষ্ণপাদের সঙ্গে কাহ্নকে একীভূত করে) স্থির করা হয়েছে বারোশো শতকের মধ্যে। এটিকেই চর্যাগীতির রচনার নিম্নসীমা ধরা হয়। “The period 950-1200 A.D. would thus seem to be a reasonable date of give to these poems” (O.D.B.L.)

পদসংখ্যা ও চর্যার ভাষা

চর্যাগীতিতে পদের সংখ্যা ছিল একান্নটি। তার মধ্যে তিনটি পুরো পদ এবং একটির শেষাংশ পাওয়া যায়নি। চর্যাপদের টিকাকার হলেন মুনিদত্ত।

১৯২৬ সালে ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘The Origin and Development of the Bengali Language’ গ্রন্থে বিস্তারিত আকারে চর্যাপদের ভাষার বিষয়টি আলোচনা করেন। তিনি ধ্বনিতত্ত্ব (phonetics), ব্যাকরণ (morphology) ও ছন্দ বিচার করে সিদ্ধান্তে আসেন যে এটি আদিতম বাংলা ভাষায় রচিত। তবে এতে শৌরসেনী অপভ্রংশের প্রভাব রয়েছে এবং কিছু কিছু মৈথিলী শব্দও রয়েছে। ডঃ মহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর গবেষণাপত্রে সুনীতিকুমারের মতকে সমর্থন করেছেন। পরবর্তী ভাষাবিদগণও এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছেন।

চর্যাভাষার আর একটি দিক হলো সন্ধ্যা/সন্ধা ভাষা। এই সন্ধ্যা/সন্ধা ভাষা বলতে কি বোঝাচ্ছে তা নিয়ে নানা ধন্দ। এক্ষেত্রে প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে চর্যাগীতির মূলবিষয় বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের আধ্যাত্মতত্ত্ব।  সাধনবিষয়ক নির্দেশ দানের উদ্দেশ্যে এগুলি রচিত। তাই প্রত্যেকটি পদ দ্ব্যর্থক অর্থ প্রকাশ করে। এবং সেই জন্যই হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বোঝা না বোঝায় মেশা ‘আলো আঁধারি ভাষা’; সন্ধা শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থবিচার (বিধুশেখর শাস্ত্রী কর্তৃক); সাঁওতাল পরগনা ও বীরভূমকে সন্ধা দেশ বলে অভিহিত করে এটিকে সেখানকার উপভাষা আখ্যা দেওয়া (পাঁচকড়ি‌ বন্দ্যোপাধ্যায়).. ইত্যাদি সব মাথায় রেখেও বলা যায় চর্যার ভাষা হল, “আসলে গূঢ়ার্থ প্রতিপাদক এক ধরনের বচনসংকেত”।

চর্যাগীতির সাহিত্যমূল্য ও কাব্যরস

চর্যাগীতি প্রধানত তত্ত্ববাদের বাহন, গৌণত কবিতা। এটা প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হবে। কাব্যচর্চা করার জন্য সিদ্ধাচার্যরা এগুলি লেখেননি। “কাব্যের কাব্যত্বগুণ নির্ভর করে সৌন্দর্যব্যঞ্জনায় ও রসের উত্তরণে। এই বিচারের দুটি দিক– কাব্যের ভাবরস ও প্রকাশভঙ্গির চারুত্ব। চর্যাগীতি আধ্যাত্মসঙ্গীত হলেও বহিরঙ্গের রসাবেদনে ও সৌন্দর্য ব্যঞ্জনায় এগুলিকে কাব্যের কোটা থেকে বাদ দেওয়া যায় না।”.. অধ্যাপক জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তীর এই উক্তি চর্যাপদের কাব্যমূল্য সম্পর্কে অবশ্যই একটি নির্ণায়ক অভিমত।

চর্যার ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট

উত্তর বিহার ও কলিঙ্গের অংশ এবং বাংলা ও কামরূপ– প্রধানত এই অঞ্চল চর্যাপদের পটভূমিকা বলে পণ্ডিতগণ মত প্রকাশ করেন। তবে নদীমাতৃক বাংলার ও বাঙালির জীবনযাত্রার বহু ছবি পদগুলিতে যেরকম প্রকট ভাবে উপস্থাপিত,তা বাংলার এক সহজ ও সাবলীল চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে। আসলে রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়ামকদের জারি করা কোন বিশেষ সীমারেখাতে কাব্য দর্শন বা তত্ত্বকে বাঁধা যায় না, চর্যাগীতি এই সত্যকেই প্রকাশ করে।

সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব: 

চর্যার পদগুলিকে তৎকালীন ধর্মীয় ও সামাজিক নানা আচার-বিচার, উৎসব-অনুষ্ঠান,ক্রিয়াকর্মের ও পরিচয় পাওয়া যায়। “ডোম্বী বিবাহিআ অহারিউ জাম”- পদটিতে ধুমধাম করে বিবাহ অনুষ্ঠানের বর্ণনা পাওয়া যায়। উৎসব অনুষ্ঠানে ডমরু, মাদল, বাঁশী, বীণা প্রভৃতি বাদ্য বাজনা ও নৃত্যগীতের আয়োজন ও থাকতো। “নাচন্তী গাইল বাজন্তী দেবী” পঙ্কতিটি তারই সাক্ষ্যবাহী।

যৌতুক প্রথা: 

বিবাহ উৎসবে যৌতুক প্রথা ও প্রচলিত ছিল। “জাউতুকে কি অ আনতু ধাম” – পঙ্কতি বিবাহে যৌতুক দেওয়া রীতির পরিচয় পাওয়া যায়।

গৃহস্থ সংসার: 

শশুর, শাশুড়ি, ননদ পরিবৃত গৃহস্থবধূর সংসার, আঁতুরঘর,হাঁড়ি ঘড়া প্রভৃতি নিত্যব্যবহার্য বাসনপত্র, টাঙ্গি-কুঠার প্রভৃতি হাতিয়ারের ব্যবহার- এককথায় চর্যাপদে গৃহস্থ সংসারের স্পষ্ট ছবি বর্তমান।

বর্ণভেদ ও অস্পৃশ্যতা: 

জাতপাতের বিভেদ ও অস্পৃশ্যতা বিদীর্ণ সমাজের কলঙ্কিত মুখচ্ছবি ও ফুটে উঠেছে চর্যাপদে। অস্পৃশ্য বলে একঘরে করে রাখার প্রথা প্রচলিত ছিল। “টালত ঘর মোর নাহি পড়বেশী”- পদটিতে সেই একাকীত্বের ছবি মর্মস্পর্শী ভাষায় অঙ্কিত হয়েছে।

উপসংহার:

চর্যাপদ যদিও বৌদ্ধ সাধন সংগীত তার সত্বেও তা সমকালীন সমাজের জীবন্ত দলিল এবং সম্ভবত এই সমাজ ব্যবস্থায় সমকালীন গৌড় বঙ্গের সমাজ জীবনেরই ছায়াপাত ঘটেছে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Lates education news. Psd dm developments north west. Cornell university scholarship.