‘বলাকা’ কাব্যের অন্তর্গত ‘শঙ্খ’ কবিতার মর্মার্থ লিখুন।

‘বলাকা’র কবিতাগুলি রচনার সূচনা ১৩২১ সালের ১৫ই বৈশাখ (১৯১৪) শান্তিনিকেতনে, শেষ কবিতা লেখা হয় কলকাতায় ৯ই বৈশাখ ১৩২৩ (১৯১৬) এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশ (মে, ১৯১৬)। মূলপাঠের কবিতাটির (৪নং) রচনা, ১২ই জ্যৈষ্ঠ ১৩২১ রামগড়ে এবং এটি আষাঢ়ের ‘সবুজপত্র’-এ প্রকাশিত হয়। কবি এ সময় জ্যৈষ্ঠ মাসে হিমালয়ের রামগড়ে। তাঁর মনে দারুণ অশান্তি ও বেদনাভার। একমাত্র অ্যান্ড্রুজ এ খবর জানতেন। কবি বলেন, “খবর পাইনি, প্রমাণ পাইনি, তবু মনে হচ্ছিল সারা জগৎ জুড়ে যেন একটা প্রলয় কান্ড আসছে। বিশ্বব্যাপী একটা ভাঙাচোরা প্রলয় কান্ডের উদ্যোগ চলছে। ৫ই জ্যৈষ্ঠ থেকে ১২ই জ্যৈষ্ঠ্যের মধ্যে আমার দুই, তিন, চার নম্বর কবিতা একে একে এল। তখনও য়ুরোপের মহাযুদ্ধের খবর এদেশে আসেনি, – আমার চার নম্বর কবিতা (শঙ্খ) লেখবার পর যুদ্ধের খবর পেলাম। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে প্রথম মহাযুদ্ধের সূচনা ২৮শে জুলাই ১৯১৪ (শ্রাবণ ১৩২১) শেষ ভার্সাই চুক্তিতে ২৮শে জুন, ১৯১৯।

যুদ্ধ কোনো সময়ই কারও কাঙ্ক্ষিত নয়। যুদ্ধ মানুষের সুখশান্তি শ্রী ও সম্পদের সর্বনাশ ঘটায়, অপরিসীম দুঃখ বেদনা ও ধ্বংসকে বয়ে আনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সীমাহীন লোভ ও দম্ভ জগতের অন্তরাত্মাকে পীড়িত করে আত্মপ্রকাশ করল। যুদ্ধে শঙ্খ বেজে উঠল। দারুণ প্রলয়ের সূচনা হল। বিশ্বের ১৮টি দেশ ক্রমান্বয়ে সর্বনাশা এই মহামরণযজ্ঞে জড়িয়ে পড়ল।

এ সময় শান্তি, স্বস্তি ও কল্যাণধর্মের তপস্যায়, সৌন্দর্যের রজনীগন্ধা নয়, মানবকল্যাণে, অনিবার্যকে ধ্বংসকে রোধ করতে রক্তজবার মালা নিয়ে যুদ্ধে ব্রতী হতে হবে। শান্ত সন্ধ্যায় পূজা-বন্দনা স্বাভাবিক কিন্তু বিধাতার আহ্বান যখন মহাশঙ্খধ্বনিতে এসে পৌঁছায় তখন আর উদাসীন থাকা সম্ভব হয় না, সাড়া দিতেই হয়। বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের দিনে সচেতন মানুষ মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে না। তাই এ কবিতায় দিদিগন্তব্যাপী অন্ধকারের মধ্যে কবি যুদ্ধের উপযোগী দীপক তানের সংগীতকে প্রার্থনা করেছেন। যৌবনের দুর্দমনীয় প্রাণশক্তিকে আহ্বান করেছেন। ‘বলাকা’র কবিতায় কবি ‘অজর-অমর-অক্ষয়’ যৌবনের বন্দনা বার বার করেছেন। এখানেও তিনি প্রাণের হর্ষদীপ্তিকে কামনা করেছেন। দীপক রাগের ছোঁয়ায় যে আগুন জ্বলবে তাতে সমস্ত কলুষ, কল্মষ ক্ষয় হবে, অন্যায়ের অন্ধকার বিদূরিত হবে, দুহাতে শঙ্খ তুলে মানবাত্মার জয়ধ্বনি তখনই সম্ভব হবে।

কবিতার উপসংহারে দেখি বিরামে বিশ্রামে অলস জীবনযাপনের গ্লানিতে লজ্জিত কবি-আত্মা সে জড়তা কাটিয়ে ওঠবার জন্য রণসজ্জায় সজ্জিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জানিয়েছেন। বস্তুত এই কবিপ্রাণ বিশ্বমানবতার কল্যাণকামী, সর্বমানুষের অন্তর্গত সত্তা। এভাবে কবি ব্যষ্টি থেকে সমষ্টিতে পৌঁছেছেন। একক হৃদয়ের বেদনার ভার এভাবে বিশ্বমানবতার কল্যাণে ‘অভয় শব্ঙ্খ’ হাতে তুলে নেওয়ার কথাতে সমাপ্ত হয়েছে। বলাকার অব্যবহিত পূর্ববর্তী কাব্য ‘গীতাঞ্জলি-গীতিমাল্য-গীতালি’-র কবিতাগুলিতে ভগবভক্তি ও ঈশ্বরানুভূতির আভাস খুবই স্পষ্ট। কিন্তু কবিচিত্ত এখানে দীর্ঘদিন স্থায়ী থাকতে পারেনি। চিরচঞ্চল, চিরপথিক কবি হৃদয়, গতিহীন অধ্যাত্মরসবোধে, অধ্যাত্ম উপলব্ধির মধ্যে স্থায়ী হন না। কবি ভক্ত সাধক নন, তাই বিপরীত শক্তির অভিঘাতে নিসর্গ ও বিপুল মানববিশ্বকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলেন। প্রমথনাথ বিশীর ভাষায় এতদিনের সীমা থেকে অসীম দেখা নয়, এবার অসীমের দৃষ্টিতে সীমাকে দেখার যাত্রা শুরু হল। ‘বলাকা’য় কবি প্রেম জীবন যৌবনের জয়গান করেছেন, ও চিরচঞ্চল গতিশীলতার কথা বলেছেন। এর পেছনে সমকালীন কয়েকটি ঘটনার অবদান থাকা অসম্ভব নয়। (১) ‘সবুজপত্র’- সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ (১৯১৪) চলিত বাংলায় সংস্কারমুক্ত গতিশীল জীবন যৌবনের কথা বলার প্রতিশ্রুতি। (২) ইউরোপের উদ্দম সমাজ, তার অদ্ভূত কর্মচাঞ্চল্য তার সংঘাত সংঘর্ষ। (৩) ফরাসি দার্শনিক বেশি-র elan vital এর দার্শনিক তত্ত্ব কবি মানসে কিছু প্রভাব ফেলে থাকবে। কোর্স-এর মতে জগতের সবকিছুই এক রূপ থেকে অন্যরূপে পরিবর্তিত হচ্ছে। গতিই হল কালপ্রবাহ। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। ‘বলাকায়’ এই চলার কথাই প্রধান। গতিতত্ত্বই বলাকার মূলসুর। বলাকা গতিরাগের কাব্য। এ গতি অসীমে ধাবমান। তাই উদ্দেশ্যহীন নয় আনন্দের রসলোকে পৌঁছানোই তার মূল লক্ষ্য। কবি যৌবনের মধ্যে সেই গতিকে দেখেছেন। কালধর্মে মানুষের শক্তি জীর্ণতাপ্রাপ্ত হয়ে সংস্কারের ঘেরাটোপে জড়িয়ে পড়ে। যৌবনের দুর্গম প্রাণশক্তি সেই রুদ্ধ স্রোতকে মুক্ত করতে পারে বলেই তিনি ‘সবুজের অভিযান’ আকাঙ্ক্ষা করেছেন। শঙ্খ (৪নং) কবিতায় তাই তিনি প্রার্থনা করেছেন-

যৌবনের পরশমণি করাও তবে স্পর্শ

দীপক তানে উঠুক ধ্বনি / দীপ্ত প্রাণের হর্ষ।

যৌবন গতিস্রোত আনে, সে নিয়ত গতিমান। বিশ্ব প্রকৃতিতে যে গতি, মানুষের ব্যক্তিজীবনেও সেই গতি। কবি ‘বলাকায়’ এই গতিকেই অনুভব করেছেন।

কবি ‘বলাকা’য় জীবনের গতিকেই প্রকাশ করতে গিয়ে তার ছন্দপ্রকরণেও সেই গতিশীলতা নিয়ে এসেছেন। এই গতির প্রয়োজনে কবিতার ছন্দও বন্ধনমুক্ত হয়েছে। বলাকায় এই ছন্দকে ‘মুক্তক’ নামে অভিহিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “এখানে সাবেক ছন্দকে ভেঙ্গে নতুন করে ছন্দকে” পেয়েছেন। এই ছন্দের বৈশিষ্ট্য হল কবিতার ভাবের প্রয়োজনের কখনও অসম পর্ব ও ছত্র পর্বে মাত্রাবৈচিত্র্য এবং প্রবহমানতা। বাংলার তিন ধরনের (মিশ্রবৃত্ত, সরল কলাবৃত্ত, দলবৃত্ত) ছন্দেরই মুক্তক রূপ রবীন্দ্রনাথ নির্মাণ করেছেন।

তবে একথা মনে রাখতে হবে যে ‘শঙ্খ’ কবিতা মুক্তকের উদাহরণ নয়। এখানে সাধারণ দলবৃত্তের ছত্র পিছু চারটি পর্ব ভেঙে প্রতি ছত্রে দুটি করে সাজানো হয়েছে এবং এ কবিতায় স্পষ্ট প্রবহমানতা নেই, যেমন আছে ‘নদী’ বা ‘শাহজাহান’-এ। এর ছন্দসজ্জাটি এইরকম-

তোমার শঙ্খ / ধূলায় পড়ে।

কেমন করে / সইব

বাতাস আলো / গেল মরে।

এ কীরে দু/ দৈর্ব

৪+২

(সূত্র: ১ম স্তবক)

চলেছিলেম / পূজার ঘরে।

8+8

সাজিয়ে ফুলে / অর্থ্য।

খুঁজি সারা / দিনের পরে

কোথায় শান্তি / স্বর্গ

(সূত্র: ২য় স্তবক)

এখানে দলবৃত্তের তরঙ্গময় দোলাই কবির অন্তর্গত চাঞ্চল্যকে প্রকাশ করছে। যথার্থ মুস্তকের বৈশিষ্ট্য হল ছত্রদৈর্ঘ্যের অভাবিত অসমতা এবং সেই সঙ্গে প্রবহমানতা। পর্বও প্রায়ই অসমান হয়।

প্রসঙ্গত ৬নং কবিতা ‘ছবি’ বিশ্লেষণ করে দেখা যাক-

তুমি কি কেবল ছবি/ শুধু পটে লিখা

ওই যে সুদূর / নীহারিকা

যারা / করে আছে ভিড়

/ আকাশের নীড়;

এটি মিশ্রবৃত্ত পয়ার জাতীয় মুক্তক। এতে অন্ত্যমিল থাকলেও পর্বে ও পড়স্তিতে মাত্রাসমকত্ব নেই।

ড. নীহারঞ্জন রায় বলেছেন ‘বলাকা’র ছন্দ যেন যৌবনের ছন্দ, দৃপ্তযোগে কলনৃত্যে ছুটিয়া চলিয়াছে,

যেন ভাদ্রের ভরা জোয়ারের বিরাট নদী। এ ছন্দে আছে মুক্তির আশ্বাস। এর সূচনা মধূসূদনের অমিত্রাক্ষর বা

প্রবহমান পয়ারে, পরিণতি রবীন্দ্রনাথের ‘পুনশ্চ’র গদ্য কবিতা ছন্দে। এবাবে বাংলা কাব্যে অতুলনীয় সমৃদ্ধি

এসেছে।


‘মানুষের ধর্ম’ প্রবন্ধগ্রন্থ অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবোধের পরিচয় দিন।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Hap 2nd semester notes pdf download. Photoshop dm developments north west. A case study of zaki flour mills).