‘বড়োবাবুর কাছে নিবেদন’ কবিতায় ‘বড়োবাবু’ কে? তাঁর কাছে কবির প্রার্থিত বিষয়গুলির পরিচয় দাও।   অথবা   ‘বড়োবাবুর কাছে নিবেদন’ কবিতার ভাববস্তু বিচার করো।   অথবা    ‘বড়োবাবুর কাছে নিবেদন’ কবিতায় কবির স্বদেশ চেতনার পরিচয় দাও।  

‘বড়োবাবুর কাছে নিবেদন’ কবিতাটি অমিয় চক্রবর্তীর ‘মাটির দেয়াল’ (১৯৪২) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। লণ্ডনে বসবাসকালে কবি এই কবিতাটি রচনা করেছেন। কবিতাটির মধ্যে বঙ্গদেশের নানান চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।

কবিতাটিতে ‘বড়োবাবু’ বলতে বোঝানো হয়েছে কেরানির থেকে কিছুটা উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে। ইংরেজ আমলে বিভিন্ন অফিস-আদালত-কোম্পানিতে বড়বাবুর দাপট ছিল অপরিসীম।

আত্মকথনরীতিতে রচিত এই কবিতায় কবির সমাজ ও স্বদেশ চেতনার সার্থক প্রকাশ লক্ষ করা যায়। বড়োবাবুর মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দ্বারা অধঃস্তন কর্মচারীরা চিরদিন শোষিত হয়। কিন্তু তবুও সেই অধঃস্তন কর্মচারীর জীবনে নিজস্ব কিছু বিষয় থাকে, নিজস্ব কিছু ভাবনা থাকে যার উপর বড়োবাবু কখনোই হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। কবি সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন-

“তালিকা প্রস্তুত

কী কী কেড়ে নিতে পারবে না-

হই না নির্বাসিত কেরানি।”

তালিকার শুরুতেই আছে বাস্তভিটের কথা, যেখানে কেরানি তার নিজের মনের আনন্দে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারবে। এরপর আছে পৃথিবীর আলো, হাওয়া, জলের কথা- যার ওপর তার পূর্ণ অধিকার আছে-

“কুয়োর ঠাণ্ডা জল, গানের কান, বইয়ের দৃষ্টি

গ্রীষ্মের দুপুরে বৃষ্টি।

আপনজনকে ভালোবাসা,

বাংলার স্মৃতিদীর্ণ বাড়ি ফেরার আশা।”

এখানে একদিকে যেমন কবির প্রবাসী জীবনের যন্ত্রণা প্রকাশিত হয়েছে তেমনি একটা সাম্যবাদের ধারণাও প্রকাশিত হয়েছে। পৃথিবীর আলো-বাতাস-জলের উপর সকলের সমান অধিকার। কোনো শোষকশ্রেণী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা শোষিত, অবহেলিত নিম্নপদস্থ কর্মচারীর কাছ থেকে এই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। কেড়ে নিতে পারে না তার বাক্তিগত অনুভবের জায়গাগুলো। কবি এই সমান অধিকারের ভাবনার মধ্য দিয়ে কেরানি তথা নিম্নবৃত্ত ও মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনের অধিকারকে অনেকটাই প্রসারিত করে দিয়েছেন।

বাংলার স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি ফেরার যে আশার কথা কবি শুনিয়েছেন, তা আরো গভীরভাবে ব্যক্ত হয়েছে কবিতার পরবর্তী অংশে। প্রাচীন গাছের ছায়া, তুলসী-মণ্ডপ, নদী তীরের পোড়ো দেউল, মাতৃভাষার মায়া, ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখা ধানের মাড়াই, কলা গাছ, রাস্তার কুকুর, খিড়কি- ঘাট, সবুজ কচুরিপানায় ভরা ডোবা প্রভৃতি চিত্র তো বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবেশের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এখানে স্বদেশের প্রতি কবির হৃদয়ের এক সুগভীর শ্রোদ্ধা ও ভালোবাসাই ব্যক্ত হয়েছে।

তালিকা এখানেই শেষ নয়। কবি এ প্রসঙ্গে বলেছেন-

“তোমায় শোনাই, উপস্থিত ফর্দে আরো আছে-

দূর-সংসারে এলো কাছে

বাঁচবার সার্থকতা।”

কবিতার মধ্য দিয়ে কবি অমিয় চক্রবর্তী এক চিরন্তন সত্যকে উপস্থাপন করেছেন। কোনো বড়োবাবুই মানুষের কাছ থেকে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, তার স্বপ্ন দেখার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। প্রবাসী জীবনের যন্ত্রণাই হোক, আর সমান অধিকারের ভাবনাই হোক, কবি আলোচ্য কবিতায় মানুষের ঘরের স্বপ্ন, স্বদেশের স্বপ্ন, বেঁচে থাকার স্বপ্নকেই সার্থক করে তুলেছেন আলোচ্য কবিতায়।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Graphic designer job. Blog dm developments north west. The problems of classroom management and control in secondary school.