‘ফ্যান’ কবিতাটির বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করো।   অথবা  ‘ফ্যান’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।    অথবা  ‘ফ্যান’ কবিতায় মন্বন্তরের ছবি ও কবির সহৃদয় মনোভাবের পরিচয় দাও।   অথবা ‘ফ্যান’ কবিতা অবলম্বনে কবির সমাজ চেতনার পরিচয় দাও।  

প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত ‘ফ্যান’ কবিতাটি ‘ফেরারী ফৌজ’ (১৯৪৮) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। কবিতাটির মধ্যে প্রেমেন্দ্র মিত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পঞ্চাশের মন্বন্তরের দ্বারা প্রভাবিত বাংলাদেশের বিপর্যন্ত রূপের বাস্তবচিত্র অঙ্কন করেছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কৃত্রিম পণ্য সংকট সৃষ্টি করে কালোবাজারি শুরু করে। ১৯৪৩-এর বন্যা ও সাইক্লোন এই সকল অসাধু ব্যবসায়ীদের আরো সুবিধা করে দেয়। গ্রাম-বাংলার হাজার হাজার কৃষক ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে প্রচণ্ড অর্থিক সংকটের সম্মুখীন হয়। দেশে অন্ন-বস্ত্রের অভাব না থাকা সত্ত্বেও একটা কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। সেই অন্নহীন অর্থহীন পরিস্থিতিতে কৃষিজীবী মানুষেরা ঘটি-বাটি, গরু-মোষ, জমি-জায়গা বিক্রি অথবা বন্ধক রেখে একমুঠো অন্নের প্রত্যাশায় ঘর-বাড়ি ছেড়ে সপরিবারে শহরে এসে উপস্থিত হয়। গ্রামের সহজ-সরল কৃষিজীবী মানুষেরা ভেবেছিল শহরে এসে যে কোনো কাজের বিনিময়ে পরিবার-পরিজনের মুখে দু-বেলা অন্ন তুলে দিতে পারবে। কিন্তু তাদের আশা পূর্ণ হয়নি। কর্মসংস্থানের অভাবে কৃষিজীবী মানুষেরা শহরের রাজপথে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে। তাদের আর্তনাদে শহরের গৃহস্থ পরিবারগুলি প্রথম প্রথম দু-মুঠো ভাত-ডাল দিলেও কিছুদিনের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়। তখন ক্ষুধার্ত মানুষেরা দুয়ারে দুয়ারে ভাতের পরিবর্তে একটু ফ্যানের জন্য হাহাকার করতে থাকে। আলোচ্য কবিতায় কবি সেই সকল অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানহীন মানুষের জীবনচিত্রকেই তুলে ধরেছেন।

কবিতার শুরুতেই কবি নগরের পথে পথে ঘুরে বেড়ানো অদ্ভুত এক জীবের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন-

“নগরের পথে পথে দেখেছ অদ্ভুত এক জীব

ঠিক মানুষের মতো কিংবা ঠিক নয়,

যেন তার ব্যঙ্গ-চিত্র বিদ্রূপ-বিকৃত!”

রুণ কঙ্কালসার মানুষগুলোকে আর মানুষ বলে চেনা যায় না। তাই কবি লিখেছেন-

“তবু তারা নড়ে চড়ে কথা বলে, আর

জঞ্জালের মত জমে রাস্তায়-রাস্তায়।”

ক্ষুধার জ্বালায় তারা পথের ধারে নোংরা-আবর্জনার মধ্য থেকে উচ্ছিষ্ট খোঁজে, আর অসহায়ভাবে ভাতের ফ্যান চায়। তারা সাম্রাজ্যবাদীদের মতো রক্ত, মাংস, সবুজ-সতেজ কলিজা চায় না। তারা চায় শুধুমাত্র একটু ফ্যান। কবি বিদ্রুপ করে তাদেরকে ‘মানুষের সৎভাই’ বলেছেন। সুপ্রাচীনকাল থেকেই বিমাতার সন্তানেরা অর্থাৎ সৎভাইয়েরা যেমন সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত থেকেছে, এরাও তেমনি মানুষের স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। অথচ সভ্যতা গড়ে তোলার পেছনে এদের অবদানের কথা অস্বীকার করা

যায় না। কিন্তু আজ সভ্যতা সে কথা ভুলে গেছে। এই মানুষগুলোই একদিন মাটিতে চাষ করে ফসল উৎপাদন করেছিল। কিন্তু তারাই আজ ভুলে গেছে-

“কত-ধানে হয় কত চাল;

ভুলে গেছে লাঙলের হাল কাঁধে তুলে নেওয়া যায়।”

তারা তাদের জোটবদ্ধ শক্তির কথাও ভুলে গেছে। তারা জানে না তাদের সম্মলিত শক্তি উন্মত্ত সমুদ্রের চাইতেও শক্তিশালী। যে শক্তির আঘাতে মুহূর্তে টলিয়ে দেওয়া যায় সভ্যতার কঠিন পাহাড়কে।

কবি নগর সভ্যতার চরম নিষ্ঠুরতার প্রতি ধিক্কার জানিয়েছেন। একদিন যারা এই সভ্যতার মুখে অন্ন তুলে দিয়েছে, আজ তাদের মুখেই ঢেলে দেওয়া হচ্ছে অন্ন ছেঁকে নেওয়া ফ্যানটুকু। মানবতার এই অপমান কবি সহ্য করতে পারেননি। তাই মদরূপী মৃত্যুর বিকারে ভুলিয়ে দিতে চান তাদের যাবতীয় জীবনযন্ত্রণা। তিনি বলেছেন-

“তার চেয়ে রাখি যদি ফেলে, পচে পচে আপন বিকারে এই অন্ন হবে না কি মৃত্যুলোভাতুরা অগ্নি-জ্বালাময় তীব্র সুরা !”

তবে আশ্চর্য তাদের প্রাণশক্তি। মাতৃস্তন্যহীন, কঙ্কালসার শরীরে শিশুরা রাজপথের পাশে পড়ে থাকে। এই দৃশ্য দেখে কবির মনে হয়েছে, তাদের হাড় যেন দধিচীর হাড়ের চাইতেও শক্ত। তা না হলে দুর্ভিক্ষ, অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে তাদের তো ক্ষয়ে যাওয়ার কথা ছিল-

“রাজপথে এই সব কচি কচি শিশুর কঙ্কাল-মাতৃস্তন্যহীন, দধীচির হাড় ছিলো এর চেয়ে আরো কি কঠিন?”

এইভাবে সমগ্র কবিতায় একদিকে কবি যেমন দুর্ভিক্ষপীড়িত ক্ষুধার্ত মানুষের অসহায় জীবনের ছবি তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে তেমনি স্বার্থলোভী আধুনিক নগর সভ্যতার মুখোশ খুলে দিয়ে সমাজ চেতনার পরিচয় দিয়েছেন— এখানেই কবিতাটির সার্থকতা এবং নামকরণ সার্থক।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Industrial pharmacy 7th semester notes pdf download. Hammers dm developments north west. Yangzhou university scholarships 2024.