পৌরাণিক অনুষঙ্গ ও যুদ্ধবিধস্ত পটভূমিতে আশার বাণী উচ্চারিত হয়েছে ‘ক্রেসিডা’ কবিতায়- আলোচনা করো।   অথবা   ‘ক্রেসিডা’ কবিতাটির বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করো।  অথবা  ‘ক্রেসিডা’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। 

বিষ্ণু দে রচিত ‘ক্রেসিডা’ কবিতাটি ‘চোরাবালি’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। ‘ক্রেসিডা’ একটি উল্লেখযোগ্য প্রেমের কবিতা। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘কবিতা’ পত্রিকায়, তখন কবিতাটির নাম ছিল ‘মৃত্যু, প্রেম ও মহাকাল’।

ট্রয়ের রাজপুত্র ট্রয়লাস এবং ক্রেসিডার প্রেম ও বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে হোমারের মহাকাব্যে একটি গৌণ আখ্যান রয়েছে। পরবর্তীকালে এই গৌণ আখ্যানকে কেন্দ্র করে ইউরোপে একাধিক সাহিত্য রচিত হয়েছে। যেমন-

১. Benoit de Sainte-Maure রচিত ‘Roman de Troie’ কাব্য।

২. বোকাচ্চিও রচনা করেন ‘Filostrato’ কাব্য।

৩. চসার রচনা করেন মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসধর্মী ইতিবৃত্ত ‘Troilus and Criseyde’ (ট্রিয়লাস অ্যান্ড ক্রিসেড)।

৪. শেক্সপীয়র রচনা করেন ‘ট্রয়লাস ও ক্রেসিডা’ নাটক।

৫. রবার্ট হেনরিসন্ রচনা করেন ‘The Treatment or Cresseid’ কাব্য।

প্রেমের ক্ষেত্রে নারীর বিশ্বাসহীনতা, স্বেচ্চাচারিতা ও জৈবিক সম্পর্কের দিকটি ইউরোপের ক্রেসিডাকেন্দ্রিক সাহিত্যের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছিল। এই ট্রয়লাস-ক্রেসিডাকেন্দ্রিক প্রণয় কাহিনিকে উপজীব্য করেই বিষ্ণু দে রচনা করেন ‘ক্রেসিডা’ কবিতাটি। কবি গ্রীক পুরাণের ট্রয়লাস-ক্রেসিডার প্রেমকাহিনির নবরূপায়ন ঘটিয়েছেন আলোচ্য কবিতায়।

কবিতার শুরুতে ট্রয়লাসের আত্মপরিচয়ের মধ্যে তার ব্যক্তি সংকটের দ্বান্দ্বিক রূপটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কল্পজগতের বাসিন্দা ট্রয়লাস পূর্ণতা লাভের আকাঙ্ক্ষায় বিনিদ্র রজনী যাপন করে। তার প্রেমিক হৃদয় ব্যর্থতা, আশাহীনতা ও শূন্যতাবোধে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। এরকম সময়ে প্রেমিকা ক্রেসিডার সান্নিধ্যে তার শূন্য-শুষ্ক হৃদয়ে নামে বর্ষার জলধারা। কবি লিখেছেন-

“দিনগুলি তুমি তুলে নিলে অঞ্চলে

বালুচরচারী দৃষ্টিতে ঝরে সান্নিধ্যের ধারা।”

ক্রেসিডার প্রতি ট্রয়লাসের সর্বসমর্পিত প্রেম অচিরেই সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। ট্রয়ের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাদের প্রেমও বিপর্যস্ত হয়। কবি প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে প্রেমের সেই ভঙ্গুর রূপটিকে তুলে ধরেছেন-

“বৈশাখী মেঘ মেদুর হয়েছে সুদূর গগনকোণে।

কুরুক্ষেত্রে উড়েছে হাজার রথচক্রের ধুলি।

স্বপ্ন-গোধুলি ডুবে গেলো খর-রক্তের কোলাহলে।”

প্রেমের ব্যর্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর ট্রয়লাসের জীবন আবার ‘তপ্ত মরুর জনহীনতায়’ পর্যবসিত হয়। চরম নৈরাশ্য আর সংশয় তাকে গ্রাস করে। এরকম সময়ে তার পাশে নেই বন্ধু প্যান্ডার, যে একদিন তাকে প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার জন্য উৎসাহ দিয়েছিল। প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার জন্য উৎসাহ দেওয়ার মতো বন্ধু সবসময় পাওয়া যায়, কিন্তু প্রেমের সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সান্ত্বনা ও সাহস জোগানোর মতো বন্ধু পাওয়া যায় না। তাইতো জীবন হয়ে ওঠে নিরর্থক ও মূল্যহীন।

ট্রয়লাসের মনে ক্রেসিডার নানান স্মৃতি জেগে উঠলেও সে তার ব্যর্থ প্রেমের সংকীর্ণ গণ্ডীতে আবদ্ধ না থেকে এক বৃহত্তর জীবনসত্যে উপনীত হতে চেয়েছে। বিশ্বাসঘাতিনী প্রেমিকার উদ্দেশ্যে সে বলেছে-

“তুমি ভেবেছিলে উন্মাদ ক’রে দেবে? উদ্ধায়ু আজো হয়নি আমার মন। লোকায়ত মোর স্বেচ্ছাবর্মে লেগে বর্শা তোমার হয়ে গেলো খানখান।”

ট্রয়লাসের চিন্তা উপনিষদের বাণীর মতোই শুদ্ধ ও অপাপবিদ্ধ। তাই সে ক্রেসিডার ক্ষণিক প্রেমের স্মৃতিকে ভুলে প্রেমে ও রণাঙ্গনে বিশ্বজয়ী হয়ে উঠেছে। কিন্তু চাইলেই তো সবকিছু চিরতরে ভোলা যায় না। তাই কবি লিখেছেন- “স্মরণ তোমার হানে আজো তরবারি!”

ট্রয়লাস এবং ক্রেসিডার পৌরাণিক অনুষঙ্গ ও যুদ্ধবিধস্ত পটভূমিকে অবলম্বন করে ব্যর্থ প্রেমের দুঃখ ভুলে বাস্তব জীবনের পথে এগিয়ে চলার আশার বাণী উচ্চারিত হয়েছে ‘ক্রেসিডা’ কবিতায়। মূলত ক্রেসিডাকে উদ্দেশ্য ও অবলম্বন করেই কবিতাটি রচিত হয়েছে, তাই কবিতার নামকরণ ‘ক্রেসিডা’ সার্থক হয়েছে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Lates education news. Hmo re development dm developments north west. Yale university scholarships 2024.