নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘হঠাৎ শূন্যের দিকে’ কবিতার ভাববস্তু বিশ্লেষণ করো।  অথবা  ‘হঠাৎ শূন্যের দিকে’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।  অথবা  ‘হঠাৎ শূন্যের দিকে’ কবিতায় কবি নাগরিক জীবন থেকে মুক্তি প্রার্থনা করেছেন- আলোচনা করো।  

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘হঠাৎ শূন্যের দিকে’ কবিতাটি ‘নীরক্ত করবী’ (১৯৬৫) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। কবিতাটিতে নাগরিক জীবনের অসহায়তা ও চরম বিপন্নতার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। কবিতাটিতে জাদু বাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রভাব রয়েছে।

কবিতাটি প্রতীকধর্মী। কবিতায় দুটি স্তবক রয়েছে। দুটি স্তবকের শুরুতেই রয়েছে ‘ক্রমে স্পষ্ট হয় সব’। কবি বলেছেন, শহর কলকাতার রাজপথে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে কে সিংহ, কুকুর, হাতি বা সার্কাসের ঘোড়া, আবার কে টিয়া, চন্দনা কিংবা হাঙর, কুমির তা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারেন। কবি লিখেছেন-

“ক্রমে স্পষ্ট হয় সব। কে সিংহ, কুকুর, হাতি, সার্কাসের ঘঘোড়া

কে টিয়া, চন্দনা, কিংবা হাঙর কুমির।”

একটু খেয়াল করলেই স্পষ্ট হয়, কবিতায় উল্লিখিত পশুপাখির মধ্যে কোনটি হিংস্র, মাংসাশী, প্রভুভক্ত, তৃণভোজী, আবার কোনটি সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ ও আকাশচারী। কলকাতার রাজপথ পশুচারণের ক্ষেত্র নয়। সুতরাং, কবি এখানে সিংহ, কুকুর, হাতি, ঘোড়া প্রভৃতি পশুকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

সভ্যতা সৃষ্টির শুরুর দিকে মানুষ পশুর মতো হিংস্র স্বভাবের ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ ভদ্র, সভ্য হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের মধ্য থেকে পশুত্বের হিংস্র স্বভাব যে চিরতরে লুপ্ত হয়ে যায়নি, তার প্রমাণ পাওয়া যায় পথচারীদের ভিড়ে ঠাসা কলকাতার রাস্তায়। মানুষের প্রতি মানুষের অসহিঞ্চুতা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা, হিংস্রতা যেমন সিংহ, কুকুর, কুমির, হাঙরের প্রতীকে উদ্ভাসিত হয়েছে, তেমনি আবার টিয়া, চন্দনার প্রতীকে ব্যক্ত হয়েছে মানুষের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যচেতনা। কবি বলতে চেয়েছেন, এই মানবসমাজ হলো সার্কাসের সমতুল্য, এখানে বিচিত্র মনোভাবের মানুষ পাশাপাশি সহাবস্থান করে। মানুষের এই বৈচিত্র্যকে উপলব্ধি করার জন্য কবি ধর্মতলাকে বেছে নিয়েছেন। কবিতায় উল্লিখিত ‘পাঞ্জাবির হাতা নেড়ে’ উড়ে যেতে চাওয়া মানুষ আসলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতীক, যারা মূলত অভ্যাসের দাস। তবে কখনো কখনো সেই অভ্যাসের গণ্ডী ভেঙ্গে তারাও “উড়ে যেতে চায় হঠাৎ আকাশে”। এখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গতানুগতিক যন্ত্রণাদীর্ণ জীবন থেকে মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

প্রতিটি মানুষের একটা নিজস্বতা বা স্বাতন্ত্র্য থাকে। ব্যক্তি মানুষের এই স্বাতন্ত্র্যকে উপলব্ধি করতে পারলে মানুষের প্রকৃতিকে বুঝে নেওয়া সম্ভব। মানুষের প্রকৃতিকে বোঝার জন্যই কোনো এক বিকালে ধর্মতলার ভিড়ে কবি পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছেন—

“বিকেলে তিন পা হেঁটে চিনে নেওয়া যায়

কে ব্যাঘ্র, বিড়াল, হাঁস, ঝুঁটি-কাকাতুয়া;

এবং কে শাশ্বত নাবিক।”

মানুষের বিচিত্ররূপ কবির কাছে ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি চিন্তা মুক্ত হন। আর চিন্তা মুক্ত মন নিয়ে কবির পক্ষে ঘুমানো অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠে। মানুষের কাছে যখন জীবনের সব রহস্য স্পষ্ট হয়ে যায়, জীবনের সব জটিলতা উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন সে সবকিছুর মধ্যেই একটা সহজ- স্বাভাবিক রূপ লক্ষ্য করে। মনে হয় জীবনে মুক্তির সব পথ খুলে গেছে। ‘ঘুম’ শব্দটি এখানে শান্তির প্রতীক। অশান্ত, দুঃখ, যন্ত্রণাদীর্ণ জীবনে শান্তির প্রয়োজন খুব বেশি। আর তাই মানুষকে মুক্তিকামী এবং ঊর্ধ্বচারী হতে হবে। ম্যাজিসিয়ানের দ্বারা যেমন একের পর এক নতুন ম্যাজিক দর্শকরা দেখতে পায়, তেমনি ভিড়ের ভেতরে থাকা কোনো এক ম্যাজিসিয়ানের ‘হুশ্’ শব্দোচ্চারণের প্রভাবে যেন-

“ডানা ঝপটিয়ে নিখিল শূণ্যের দিকে উড়ে চ’লে গেল কয়েকটি সুন্দর মানুষ।”

পরিশেষে বলা যায় যে, কবিতাটির মধ্যে যেমন ব্যক্তি মানুষের জীবনযন্ত্রনার কথা আছে, তেমনি আছে মুক্তি লাভের আকাঙ্খা। বস্তুত, নিত্যদিনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির প্রকৃত পথ কারো জানা নেই বলেই কবি জাদু বাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়ালিজমের আশ্রয় গ্রহণ করে মুক্তির পথ অন্বেষণ করেছেন। এখানেই কবিতাটির সার্থকতা এবং নামকরণ সার্থক।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

B pharmacy 7th semester notes pdf download. Ar north america pressure washer dm developments north west. Cornell university scholarship.