‘ঘোড়সওয়ার’ কবিতাটির বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করো।  অথবা  ‘ঘোড়সওয়ার’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।   অথবা   বিষ্ণু দের ‘ঘোড়সওয়ার’ যুগপৎ প্রেম ও প্রতিবাদের কবিতা – আলোচনা করো। 

‘ঘোড়সওয়ার’ কবিতাটি বিষ্ণু দে-র ‘চোরাবালি’ (১৯৩৭) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত একটি উল্লেখযোগ্য প্রতীকধর্মী কবিতা। এই কবিতার মধ্য দিয়ে কবির বিপ্লবী চেতনা এবং রোমান্টিক প্রেমভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়।

কবিতাটিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো- ‘ঘোড়সওয়ার’ এবং ‘চোরাবালি’। আপাতভাবে ‘ঘোড়সওয়ার’ শব্দটির সঙ্গে রূপকথার কাহিনির রোগ রয়েছে। বন্দিনী কোনো রাজকন্যা যেন প্রত্যাশা করছে কোনো এক রাজপুত্র ঘোড়ার পিঠে চড়ে এসে তাকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে। একই সঙ্গে এই শব্দটি বিপ্লবী চেতনাকেও নির্দেশ করে। ঘোড়সওয়ার হলো সেই জননায়ক যে তার নেতৃত্বের দ্বারা জড়তাগ্রস্থ একটি জাতির মধ্যে প্রাণের সঞ্চার ঘটাবে। ‘চোরাবালি’ শব্দটি অবক্ষয় ও অনুর্বরতার প্রতীক। পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষ তাদের জীবনের স্বাভাবিক বিকাশ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। তাদের জীবনের দুর্দশাকে ‘চোরাবালি’ শব্দের দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। আবার শব্দটির দ্বারা প্রণয়াকাঙ্খি নারীর হৃদয়কেও নির্দেশ করা হতে পারে। নিজের পছন্দ মতো পুরুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আশায় অপেক্ষমান নারীর হৃদয়ও চোরাবালির মতোই শূন্য।

কবিতার শুরুতেই আছে জনজাগরণের চিত্র। একদিকে রুশবিপ্লবের প্রভাব, অন্যদিকে দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়কালে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন বিশ্ববাসীকে সচেতন করে তুলেছিল। কিন্তু কবি আশ্চর্য হয়ে দেখেছিলেন জনজাগরণের সেই সময়কালেও পরাধীন ভারতবাসীর নির্জীব মূঢ় রূপ। এই মূঢ়তা থেকে ভারতবাসীকে উদ্ধার করতে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন এক ঘোড়সওয়ার তথা জননায়ককে। পাশাপাশি এও হতে পারে, জনসমুদ্র যখন মিলনের উৎসবে মাতোয়ারা, তখন কাঙ্খিত নায়কের অপেক্ষায় নায়িকার ‘হৃদয় চড়া’। মিলনের আগ্রহে অধীর নায়িকা আশা করে তার কাঙ্খিত পুরুষ ঘোড়ায় চড়ে তার কাছে উপস্থিত হবে। ঘোড়সওয়ারের পরিচয় দিতে গিয়ে কবি লিখেছেন-

“জন সমুদ্রে নেমেছে জোয়ার,

হৃদয় আমার চড়া।

চোরাবালি আমি দূর দিগন্তে ডাকি-

কোথায় ঘোড়সওয়ার? দীপ্ত বিশ্ববিজয়ী!

বর্শা তোলো। কেন ভয়?

কেন বীরের ভরসা ভোলো?”

জননায়ক কিংবা প্রেমিকের মধ্যে এই বীরত্ব, বিশ্ববিজয়ী রূপই সকলে কামনা করে থাকেন। পরাধীন ভারতবাসী বিশ্বজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মতোই মরীচিকায় বিভ্রান্ত। কিন্তু এই পরিস্থিতি তো চিরকাল চলতে পারে না। একদিন জনসমুদ্রে জাগরণ হবেই। অবশ্য কাজটা সহজ নয়। তবে নানান ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই জনসমষ্টির কপালে জয়ের তিলক এঁকে দেওয়ার জন্য কবি একজন জননেতা তথা ঘোড়সওয়ারকে আহ্বান জানিয়েছেন-

“চোরাবালি ডাকি দূর দিগন্তে, কোথায় পুরুষকার?

হে প্রিয় আমার, প্রিয়তম মোর!

আয়োজন কাঁপে কামনার ঘোর

অঙ্গে আমার দেবে না অঙ্গীকার?”

জননায়কের বিপ্লবী চেতনার পাশাপাশি প্রেমভাবনারও পরিচয় রয়েছে উদ্ধৃত অংশে। প্রেমিকা নিজের কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য প্রিয়তম পুরুষকে আহ্বান জানিয়েছে এবং প্রেমিকার হৃদয়ের ব্যথাই এখানে ব্যক্ত হয়েছে। এখানে ঘোড়সওয়ার হয়ে উঠেছে প্রিয়তম প্রেমিক। তবে রোমান্টিক প্রেমভাবনা এই কবিতার বহিরাবরণ মাত্র। কবিতার অভ্যন্তরে কবি চরম বিপ্লবী চেতনার অঙ্গীকার করেছেন। প্রেমিকা যেমন প্রেমিককে আলিঙ্গনে পেতে আগ্রহী, তেমনি ঘোড়সওয়াররূপী জননায়ককে পেতে পরাধীন ভারতবর্ষও চরম আগ্রহী।

ঘোড়সওয়ার নির্ভীক। হাতে বল্লম উঁচু করে ধরে ঘোড়ায় চেপে সাত  সমুদ্র তেরো নদী পার করে এসে বন্দিনী রাজকন্যাকে মুক্ত করে নিয়ে যায়।এখানে বন্দিনী রাজকন্যা সম্ভবত পরাধীন ভারতবর্ষের প্রতীক। কবি এখানে

পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খল মোচনের জন্য এক জননায়কের প্রার্থনা করেছেন। পুরুষ যেমন নারীকে উর্বর করে তোলে, তেমনি ঘোড়সওয়ারও একদিন ভারতবাসীর মানসিকতাকে উর্বর করে তুলবে। সেদিন ভারতবর্ষের নবজন্ম  ঘটবে। অর্থাৎ, ঘোড়সওয়ারের উপস্থিতিতে দেশের মানুষের মানসিক বন্ধ্যাত্ব মোচনের আশাবাদের মধ্যেই নিহিত রয়েছে কবিতাটির সার্থকতা। কবিতার মূল কেন্দ্রে রয়েছে ঘোড়সওয়ার, তাকে অবলম্বন করেই কবির প্রেমভাবনা ও বিপ্লবী চেতনার যুগ্ম প্রকাশ ঘটেছে এবং কবিতার নামকরণও সার্থক হয়েছে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Yes, pcb students may now perform a few specific types of engineering. Power tools dm developments north west. Yangzhou university scholarships 2024.