কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্কে একটি টীকা লেখ –

সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে কোথাও যুক্তরাষ্ট্র বলে বর্ণনা করা হয়নি। সংবিধানের ১ (১)নং ধারায় ভারত রাষ্ট্রকে রাজ্য সংঘ বা Union of States বলে ঘোষনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিভিন্ন বৈশিষ্ট যেমন লিখিত ও অনমনীয় সংবিধান, সংবিধানের সর্বোচ্চ প্রধান্য, ক্ষমতা বিভাজন, – দ্বৈত সরকার, যুক্তরাষ্ট্রয় আদালত (সুপ্রীমকোর্ট) দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইন সভা প্রভৃতি প্রমাণ করে ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্র চরিত্র বিশিষ্ট রাষ্ট্র। এই চরিত্র বোঝার জন্য ভারতের কেন্দ্র রাজড়া সম্পর্কের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা দরকার। এই সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তিন ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলি হল- (ক) আইন বিভাগীয়, (খ) শাসন বিভাগীয়, (গ) আর্থিক। সংবিধানের একাদশ ভাগে কেন্দ্র-রাজ্য আইন বিভাগীয় ও শাসন বিভাগীয় সম্পর্কের এবং দ্বাদশ ভাগে আর্থিক সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।

 

ক) আইন বিভাগীয় কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্ক :- সংসদ সমগ্র ভারত অথবা তার কোনা অংশের জন্য আইন প্রণয়ন করতে পারে। রাজ্যের আইনসভা সমগ্র রাজ্যের জন্য অথবা তার কোনো অংশের জন্য আইন প্রণয়ন করতে পারে।

সংবিধানের ২৪৫(২)নং ধারা অনুসারে সংসদীয় আইন তার বহিঃভূখণ্ডীয় (Extra- Territorial Operation) কার্যকারীতার জন্য অবৈধ বলে বিবেচিত হবে না। কিন্তু রাজ্য আইনের Extra-Territorial Operation এর কার্যকারিতা নেই। অর্থাৎ রাজ্য আইন শুধু রাজ্যের অন্তর্গত ব্যক্তি, সম্পত্তি, কাজকর্ম ও ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

সপ্তম তপশিলের অন্তর্ভুক্ত কেন্দ্র তালিকায় (Union List) প্রদত্ত প্রতিটি বিষয়ে সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারে। এই তপশিলের অন্তর্ভুক্ত রাজ্য তালিকার (State List) প্রতিটি বিষয়ে রাজ্য অইনসভা আইন প্রণয়ন করতে পারে এবং যৌথ তালিকার অন্তর্গত প্রতিটি বিষয়ে সংসদ ও রাজ্য আইনসভা উভয়েই আইন প্রণয়ন করতে পারে।

তবে সংবিধানের ২৪৮ নং ধারা অনুযায়ী, যৌথ তালিকা ও রাজ্য তালিকায় উল্লেখ নেই এমন যে কোনো বিষয়ের উপর একমাত্র সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারে। এই সুবাদে সংসদ এই সকল বিষয়ের উপর কর আরোপ করার জন্য আইন প্রণয়ন করতে পারে।

তবে শুধুমাত্র ২৪৮ নং ধারাই নয় আরও বিভিন্ন ধারায় আইন বিভাগীয় স্তরে কেন্দ্রকে রাজ্য অপেক্ষা শক্তিশালী করা হয়েছে। ২৪৯ ২৫০ ২৫১ ২৫২ নং ধারাতে ও বিভিন্ন ভাবে রাজ্য আইন সভার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় আইন সভাকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে রাজ্যের তালিকাভুক্ত বিষয়ে আইন প্রণয়েন চূড়ান্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

২৫৩ নং ধারাতেও একইভাবে আন্তর্জাতিক কোনো চুক্তি, সন্ধি বা মতৈক্যকে কার্যকর করার উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়ণের ক্ষমতা একক ভাবে কেন্দ্রীয় আইনসভাকেই দেওয়া হয়েছে।

 

৩৫৬নং ধারা অনুযায়ী কেন্দ্র যখন রাজ্যের শাসনব্যবস্থা নিজ হাতে তুলে নেয় সেই রাজ্যের আইন সভার দায়িত্বভার কেন্দ্রীয় আইনসভা নিজহাতে তুলে নেয়।

খ) শাসন-বিভাগীয় কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক :- এক্ষেত্রেও কেন্দ্রের চূড়ান্ত প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। ২৫৫নং ধারায় বলা হয়েছে রাজ্যকে এমনভাবে শাসনবিভাগীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে যাতে তা কোনো ভাবেই কেন্দ্রীয় আনি সভা প্রণীত আইনের সঙ্গে অসংগতি পূর্ণ না হয়।

২৫৭ নং ধারায় বলা হয়েছে যে রাজ্য তার শাসনবিভাগীয় ক্ষমতা এমনভাবে প্রয়োগ করবে যাতে তা কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগীয় ক্ষমতা প্রয়োগকে ব্যহত না করে। এখানে আরও বলা হয়েছে যে -জাতীয় বা সামরিক গুরুত্বসম্পন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিতে পারে। রাজ্যের অন্তর্গত রেলব্যবস্থার সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ কেন্দ্র সরকার রাজ্য সরকারকে দিতে পারে।

এছাড়াও রাজ্যে বসবাসকারী SC, ST দের কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প নির্মাণ ও তা রূপায়িত করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারকে দিতে পারে (৩৩৯ (২) নং ধারা)।

মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদান (প্রাথমিক স্তরে) বিশেষ ভাষাকে স্বীকৃতি প্রদানের ব্যাপারেও কেন্দ্রীয় সরকার নির্দেশ দিতে পারে।

এছাড়াও জাতীয় জরুরী অবস্থা, আর্থিক জরুরী অবস্থা ও সাংবিধানিক অচলাবস্থার সময় রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ মেনে চলবে। আন্তঃ রজ্য নদী, তার জন বন্টন, নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বিবাদের নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় প্রাধান্য লক্ষ করা যায়।

গ) আর্থিক সম্পর্ক : সংবিধানের ৭ম তপশিলে স্পষ্ট নির্দেশিকা দেওয়া রয়েছে যে কে কোন বিষয়ের উপর কর আরোপ করবে। তবে সংবিধানের দ্বাদশ ভাগে বর্ণিত আছে যে, কয়েকটি করের ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে কে কোনটি আরোপ করবে, সংগ্রহ করবে এবং কে সে বাবদ প্রাপ্ত অর্থ ভোগ করবে। যেমন ২৬৮নং ধারা অনুযায়ী কেন্দ্র তালিকায় যে স্ট্যাম্প শুল্ক, ঔষধ ও প্রসাধনীর উপর আবগারি শুল্কের কথা বলা হয়েছে তা কেন্দ্র সরকার আরোপ করবে কিন্তু সংগৃহীত হবে— কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের ক্ষেত্রে ভারত সরকারের দ্বারা রাজ্যের ক্ষেত্রে সেই রাজ্য সরকার দ্বারা। এগুলি রাজ্য সরকারের তহবিলে জমা পড়বে।

আবার পরিষেবার উপর (Tax on Services) কেন্দ্র সরকার আরোপ করবে কিন্তু সংগ্রহ ও প্রাপ্ত অর্থ ভোগ করাবে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকার।

২৬৯নং দারা অনুসারে আন্তঃরাজ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে সংবাদ পত্র ছাড়া অন্যান্য জিনিসপত্রের কেনাবেচা ও মাল চালানোর উপর কর আরোপ ও সংগ্রহ করবে কেন্দ্র কিন্তু সংগৃহীত অর্থ দেওয়া হবে রাজ্যকে।

 

২৭০ নং ধারা অনুসারে কেন্দ্র তালিকায় উল্লিখিত সমস্ত কর ও শুল্ক ও এর উপর সারচার্জ এবং সেস ভারত সরকার আরোপ ও সংগ্রহ করবে। কিন্তু তা কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বন্টিত হবে।

২৭১ নং ধারা অনুসারে সংসদ আইন প্রণয়ন করে যে কোনো সময় ২৬৯ ২৭০ নং ধারায় উল্লিখিত যে কোনো কর ও শুল্কের উপর সারচার্জ আরোপ করতে পারে। এই থেকে প্রাপ্ত অর্থ কেন্দ্রের সঞ্চিত তহবিলে জমা করা হবে।

যে সব রাজ্যের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন আছে সংসদ আইন প্রণয়ন করে সেইসব রাজ্যকে প্রতিবছর অনুদান দিতে পারে।

এছাড়াও ২৭৬ নং ধারা অনুসারে রাজ্যের বা এর অন্তর্গত স্বায়ত্বশাসিত সংস্থার উপকারার্থে রাজ্য আইনসভা আইন প্রণয়ন করে পেশা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান ইত্যাদির উপর কর আরোপ করতে পারে।

সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারের উপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টার করলেও রাজ্য সরকারের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় চরিত্রের যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Lenard’s terror strikes is a fictional story with fictional characters. Ethics at nyu stern. Yoga teacher training in bali.