এক অসুখে দুজন অন্ধ’ কবিতাটির ভাববস্তু আলোচনা করো।   অথবা   ‘এক অসুখে দুজন অন্ধ’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।   অথবা  ‘এক অসুখে দুজন অন্ধ’ কবিতাটি অবলম্বনে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রেম ভাবনায় পরিচয় দাও।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘এক অসুখে দুজন অন্ধ’ কবিতাটি ‘উড়ন্ত সিংহাসন’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে প্রেমভাবনা। তিনি রবীন্দ্রনাথের মতো দেহাতীত প্রেমের কল্পনা করেননি। নরনারীর দৈহিক মিলনের মধ্য দিয়েই তিনি প্রেমের মাধুর্যকে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। তাই তাঁর কবিতায় প্রেম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই প্রেমকে কেন্দ্র করেই তিনি হৃদয়ের জটিলতা, বিচিত্র ভাবনা, নরনারীর একে অপরের প্রতি আসক্তি ও উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছেন। কবির বহুবিচিত্র এই প্রেমভাবনারই পরিচয় পাওয়া যায় আলোচ্য কবিতায়।

‘এক অসুখে দুজন অন্ধ’ কবিতাটি মূলত শৃঙ্গার রসের কবিতা। পুরুষের সঙ্গে প্রকৃতির মিলনের উদ্দামতার পরিচয় পাওয়া যায় কবিতাটিতে। কবি লিখছেন-

“আজ বাতাসের সঙ্গে ওঠে, সমুদ্র, তোর আমিষ গন্ধ

দীর্ঘ দাঁতের করাত ও ঢেউ নীল দিগন্ত সমান করে

বালিতে আধ-কোমর বন্ধ

এই আনন্দময় কবরে

আজ বাতাসের সঙ্গে ওঠে, সমুদ্র, তোর আমিষ গন্ধ।”

‘সমুদ্র’, ‘বাতাস’, ‘আমিষ গন্ধ’ এই শব্দগুলি যৌনতার উদ্দামতাকেই প্রকাশ করে। ‘বালিতে আধ-কোমর বন্ধ’ ও ‘আনন্দময় কবর’ অংশের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে শারীরিক মিলনের তীব্র আনন্দময় অনুভূতি। অর্থাৎ, সমুদ্রস্নানে

নেমে কবি সমুদ্র ও প্রকৃতির স্পর্শে নারীর সঙ্গে তীব্র জৈবিক মিলনের আনন্দ অনুভব করেছেন। সমুদ্রের সান্নিধ্যে কবির হৃদয় উষ্ণ ও আনন্দিত হয়ে উঠেছে। নারী যেমন

মিলনের মুহূর্তে প্রবল আবেগে পুরুষকে জড়িয়ে ধরে, তেমনি সমুদ্রস্নানে নেমে জলরাশির মধ্যে কবি প্রবল আলিঙ্গনের উষ্ণতা অনুভব করেন। শারীরিক মিলনের পাশাপাশি কবি হৃদয়ের অনুভূতিকেও প্রাধান্য দিয়েছেন-

“হাত দুখানি জড়ায় গলা, সাঁড়াশি সেই সোনার অধিক

উজ্জ্বলতায় প্রখর কিন্তু উষ্ণ এবং রোমাঞ্চকর

আলিঙ্গনের মধ্যে আমার হৃদয় কি পায় পুচ্ছে শিকড়

আঁকড়ে ধরে মাটির মতন চিবুক থেকে নথ অবধি?”

কবি এখানে দেহকে অতিক্রম করে হৃদয়কে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রেমের পূর্ণতা শুধু দৈহিক মিলনে নয়, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের মিলনেই প্রেম পূর্ণতা লাভ করে। গাছের শিকড় যেভাবে মাটিকে আঁকড়ে ধরে, কবিও সেভাবে আঁকড়ে ধরতে চায় তাঁর প্রেমিকাকে।

কবিতায় সমুদ্র তীরবর্তী প্রকৃতির রূপটি ব্যক্ত করেছেন কবি। ‘রূপোর গুঁড়ো’, ‘উড়ন্ত নুন’, ‘হল্লা হাওয়া’- এই শব্দগুলি সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার প্রকৃতি জগতকে নির্দেশ করে। কবি এই প্রকৃতির সঙ্গে একান্তভাবে মিলিত হতে চান। তাই উন্মুক্ত প্রকৃতির “পাল্লা আগল” বন্ধ করে দিয়ে তিনি প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য অনুভব করেন। এখানে প্রকৃতির রূপকে প্রেমিকার সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্নই প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ কবির প্রেম সার্থক হয়েছে।

কবিতার শুরুতে শরীরী আবেদন, তারপর হৃদয়ের অনুভব এবং শেষে ঘর বাঁধার স্বপ্ন- এভাবেই প্রেম সার্থকতা লাভ করে। এই প্রেমেই নারী- পুরুষ সকলে অন্ধ। কবি আলোচ্য কবিতায় প্রেমের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ খুব সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, এখানেই কবিতাটির সার্থকতা এবং নামকরণ সার্থক।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Yes, pcb students may now perform a few specific types of engineering. Project dm developments north west. The problems of classroom management and control in secondary school.