উত্তরবঙ্গের ভৌগোলিক ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করো।

ভৌগোলিক পরিচয়ঃ পশ্চিমবঙ্গের একটি অন্যতম ক্ষুদ্র অংশ হল উত্তরবঙ্গ। প্রকৃতপক্ষে ‘উত্তরবঙ্গ’ নামে কোন নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূ-খণ্ডের উল্লেখ নেই ভারতের জাতীয় মানচিত্রে। তা সত্ত্বেও ব্রিটিশ আমল থেকেই লোকমুখে ‘উত্তরবঙ্গ’ নামটি ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এই উত্তরবঙ্গ সম্বন্ধে বলতে গিয়ে ড. নির্মল দাশ বলেছেন, ” ‘উত্তরবঙ্গ’ বললে এখন সাধারণভাবে দেশের যে-এলাকাকে আমরা বুঝি, সুদূর অতীতে তো বটেই, এমনকি অদূর অতীতেও সেই এলাকার বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন রাজশক্তির অধীনে ছিল। সম্ভবত উনিশ শতকের গোড়ার দিক থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন ভূখণ্ডে ইংরেজের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গঙ্গার উত্তরে ও ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমের সমতল এলাকায় একটি অখণ্ড রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণাধীন ভৌগোলিক এলাকার সম্ভাবনা দানা বেঁধে উঠতে থাকে। শুধু সমতল এলাকাতেই নয়, ইংরেজের আত্মপ্রসারশীল উদ্যোগেই সিকিম ও ভুটানের মত সংলগ্ন পার্বত্য এলাকারও কিছু কিছু অংশ ক্রমে এই নিরবচ্ছিন্ন ব্রিটিশ শাসনকর্তৃত্বের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। এইভাবে মূলত ব্রিটিশ আমলেই সমতল ও পার্বত্য এলাকা-সমন্বিত বর্তমান উত্তরবঙ্গের একটা ভৌগোলিক প্রারূপ প্রথম আভাসিত হয়ে ওঠে।”” পরবর্তীকালে প্রশাসনিক সুবিধার্থে বিভিন্ন সময়ে এই ভৌগোলিক এলাকার পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান নদী গঙ্গার উত্তরদিকের অংশটিকেই বলা হয়উত্তরবঙ্গ। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদহ এই ছয়টি জেলা একত্রে ‘উত্তরবঙ্গ’ নামে পরিচিত। প্রশাসনিক দিক থেকে এই ছয়টি জেলার সরকারি নাম ‘জলপাইগুড়ি ডিভিশন’ হলেও, কিন্তু এই প্রশাসনিক নামটি সরকারি নথিপত্রে কেবল লিখিত ভাবেই ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, মৌখিকভাবে এর নাম বাংলায় ‘উত্তরবঙ্গ’ এবং ইংরেজিতে ‘নর্থবেঙ্গল’।

ভূ-প্রকৃতিগত দিক দিয়ে উত্তরবঙ্গ তথা জলপাইগুড়ি ডিভিশনকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

ক. উত্তরের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল, খ. তরাই অঞ্চল, গ. উত্তরের সমভূমি অঞ্চল। শিলিগুড়ি মহকুমা বাদে প্রায়

সমগ্র দাজিলিং জেলা ও জলপাইগুড়ি জেলার উত্তরাংশ নিয়ে গঠিত উত্তরের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল। এই

অঞ্চল পর্বতময় হওয়ায় বন্ধুর। দার্জিলিং জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও জলপাইগুড়ি জেলার কিছু অংশ জুড়ে

রয়েছে তরাই অঞ্চল। ‘তরাই’ নামটি এসেছে ফার্সি শব্দ থেকে, যার অর্থ স্যাঁতস্যাতে ভাব। এছাড়া জলপাইগুড়ির

অধিকাংশ অংশ, সমগ্র কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ জেলা উত্তরের সমভূমি অঞ্চলের অন্তর্গত। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলির পলি সঞ্চয়ের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এই অঞ্চল। উত্তরবঙ্গের ভূ-প্রকৃতির মতো জলবায়ুর তারতম্যও লক্ষণীয়। গ্রীষ্মকালে কোন কোন অঞ্চলের গড় উষ্ণতা ৩০-৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট হয়ে থাকে। আবার শীতকালে পার্বত্য অঞ্চলে মাঝেমাঝেই তুষারপাত হয় এবং বর্ষাকালে দক্ষিণ- পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে অবিরাম বৃষ্টিপাত হয়। এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রচুর নদ-নদী প্রবাহিত হয়েছে। হিমালয়ের বরফগলা জলে পুষ্ট হওয়ায় সারাবছরই এই নদীগুলিতে জল থাকে। বর্ষাকালে বৃষ্টির জল পেয়ে এই নদীগুলি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে এবং প্লাবনের আশঙ্কা দেখা দেয়। খরস্রোতা হওয়ায় নদীগুলি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে উপযুক্ত। উত্তরবঙ্গের প্রধান প্রধান নদীগুলি হল তিস্তা, জলঢাকা, তোষা, মহানন্দা, কালিন্দী, পুনর্ভবা, কালজানি, আত্রাই, রায়ডাক প্রভৃতি।

কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের অন্যতম ফসল হল ধান ও পাট। এছাড়া গম, আখ, তিল, সরিষা, চা, ভুঁত, রেশমকীট, ডাল প্রভৃতি শষ্য চাষ করা হয়। দার্জিলিং-এর চা জগদ্বিখ্যাত। পশ্চিমবঙ্গের শতকরা ৮০ ভাগ রেশম মালদহ জেলায় উৎপাদন হয়। জলবায়ু অনুকূল হওয়ায় আর্দ্র ও শুষ্ক চিরহরিৎ এবং আর্দ্র পর্ণমোচী বৃক্ষের অরণ্য রয়েছে উত্তরবঙ্গে। এখানকার প্রধান প্রধান বৃক্ষগুলি হল-শাল, সেগুন, শিশু, শিমুল, শিরিষ, বট, অশ্বথ, বাঁশ, বেত প্রভৃতি। খনিজ সম্পদের অভাব, শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত জমির অপ্রতুলতা, অনুন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ইত্যাদি উত্তরবঙ্গের শিল্পে অনগ্রসরতার অন্যতম কারণ। তবে কোথাও কোথাও চা, কাঠ, রেশম ও পর্যটনশিল্প গড়ে উঠেছে।

উত্তরবঙ্গ তথা জলপাইগুড়ি ডিভিশনের মোট আয়তন ২১, ৬২৫০০ বর্গ কিমি। এর মধ্যে দার্জিলিং ৩,১৪৯০০ বর্গ কিমি, জলপাইগুড়ি ৬,২২৭০০ বর্গ কিমি, কোচবিহার ৩,৩৮৭০০ বর্গ কিমি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর যথাক্রমে ৩,১৪০০০ বর্গ কিমি ও ২,২১৯০০ বর্গ কিমি এবং মালদহ ৩,৭৩৩′০ বর্গ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০০১ সালের জনগণনা অনুযায়ী উত্তরবঙ্গের জনসংখ্যা ছিল ১,৪৭,২৪,৯৪০ জন। ক্রমাগত জনসংখ্যার বৃদ্ধির ফলে ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৭২,০৪,২৩৯ জন।

উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন জাতি ও জনজাতির লোক পাশাপাশি বাস করে। এদের মধ্যে অন্যতম হল বাঙালি, রাজবংশী, মেচ, ওরাও, মুসলমান, লোধা, নেপালি, ভুটিয়া, গোর্খা, টোটো প্রভৃতি জাতি-জনজাতি।

উত্তরবঙ্গের উত্তরে রয়েছে সিকিম রাজ্য ও ভুটান দেশ, পশ্চিমে বিহার রাজ্য ও দেশ নেপাল, পূর্বে অসম রাজ্য, দক্ষিণে গঙ্গানদী এবং দক্ষিণ-পূর্বে বাংলাদেশ। এই অঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থা ততটা উন্নত না হলেও এই অঞ্চলের উপর দিয়ে গিয়েছে ৩১ ও ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক। এছাড়া পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলপথ এবং বাগডোগরা বিমান বন্দরের মাধ্যমে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করা হয়। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে উত্তরবঙ্গের সাথে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Industrial pharmacy 7th semester notes pdf download. Blog dm developments north west. A case study of zaki flour mills).