অশোকের ধম্ম বলতে কী গুলি আলোচনা করো। বোঝায় ? তার ধর্মের মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্য

অশোকের ” ধম্ম ” সম্পর্কে আলোচনা কর। তাঁর ” ধম্ম ” কি বৌদ্ধ ধর্ম ছিল ? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও। ধর্ম প্রচারের জন্য অশোক কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন ?

অশোকের ” ধম্ম ” সম্পর্কে আলোচনা কর। তাঁর ” ধম্ম ” কি বৌদ্ধ ধর্ম ছিল ? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও। ধর্ম প্রচারের জন্য অশোক কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন ?

অশোকের ” ধম্ম ” :-

কলহন রচিত ” রাজতরঙ্গিনী ” গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে , প্রথম জীবনে অশোক ছিলেন শিবের উপাসক। কিন্তু কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়ঙ্কর পরিণাম তাঁর হৃদয়ে গভীর অনুশোচনার সৃষ্টি করে এবং তিনি উপগুপ্ত নামে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছ থেকে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু রোমিলা থাপারের মতে , মৌর্যযুগে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার উদ্ভব হলে একদিকে প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হয় ও অন্যদিকে বণিক সম্প্রদায় সামাজিক স্বীকৃতি লাভের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে এবং আরেক দিকে বৌদ্ধ ধর্ম জনিত সমাজ সচেতনতা রাষ্ট্রের সম্মুখে এক নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের কেন্দ্রাভিমুখী কাঠামোর সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন বলে রোমিলা থাপার মনে করেন। 

Minor Rock Edict 1 এ উল্লেখ আছে যে , বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর অশোক কপিলাবস্তু , লুম্বিনী , কুশীনগর , বুদ্ধ গয়া – ইত্যাদি তীর্থস্থানগুলি পরিভ্রমন করেন। দেশ – দেশান্তরে বুদ্ধের বাণী প্রচারের জন্য তিনি ধর্ম প্রচারকদের সিরিয়া , মিশর , এপিরাস , সিংহল – ইত্যাদি দেশে পাঠাবার ব্যাবস্থা করেন। বৌদ্ধ সংঘের সাথেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে অশোক যত্নবান ছিলেন। তিনি পাটলিপুত্র নগরে তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতি আহ্বান করেন। এর ফলে বৌদ্ধ সম্প্রদায়গুলির মধ্যে ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। 

ধর্মনীতির মূলকথা :-

বস্তুতপক্ষে অশোক বৌদ্ধ হলেও তাঁর প্রচারিত ধর্ম বৌদ্ধ ধর্ম ছিল না। অশোকের প্রচারিত ধর্ম বৌদ্ধ ধর্ম অপেক্ষা অধিক উদার ও মানবধর্মী ছিল। তাঁর ধর্মের লক্ষ্য ছিল – মানুষের মনে সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগরিত করা। রোমিলা থাপারের ভাষায় , ‘’ It was a plea for the recognition of the dignity of man and for a humanistic spirit in the activities of society ‘’.

( A History of India – vol 1, Page 86 )  

দ্বিতীয় স্তম্ভলিপিতে তাঁর ধর্মনীতির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে অশোক বলেছেন যে , ধর্ম হচ্ছে – পাপের স্বল্পতা , কল্যাণধর্মের প্রাচুর্য , দয়া , সত্য ও শৌচ। পরধর্মসহিষ্ণুতা অশোকের ধর্মনীতিকে মহিমান্বিত করেছিল। বস্তুতপক্ষে অশোকের ধর্ম ছিল উদার , কল্যাণকারী ও মানবহিতৈষী ধর্ম। তিনি ঘোষণা করেছিলেন – 

“ All men are children and just as I desire for my children that they may obtain every kind of welfare and happiness both in this and the next world ; so do I desire for all     men .’’( Rock Edict VI ) 

অশোকের ধর্ম বৌদ্ধ ধর্ম ছিল কি’না সে বিষয়ক ঐতিহাসিক বক্তব্য :-

Minor Rock Edict 1  থেকে জানতে পারা যায় যে অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে গৃহী উপাসকের মত জীবন যাপন করতেন। ” ভাবরু লিপি ” তে বৌদ্ধ ধর্মে অশোকের গভীর শ্রদ্ধার কথা জানতে পারা যায়। স্তুপ , স্তম্ভ , পর্বতগাত্রে বুদ্ধের বাণী উৎকীর্ণ করা ; বৌদ্ধ সংঘের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা ; তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতি আহ্বান – ইত্যাদি ক্ষেত্রে অশোকের নীতিতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। 

আবার অন্যদিকে ফ্লিট মনে করেন , অশোকের ধর্ম ছিল রাজধর্মের প্রতিবিম্ব। রাজনৈতিক ও নৈতিক অনুশাসনের মধ্যে প্রজাপালন তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল। রিজ ডেভিডস এর মতে , অশোকের ধর্মকে কোনও একটি নির্দিষ্ট ধর্ম না বলে কর্তব্য – কর্মের নীতি বলাই সমীচীন। পাণিকরের মতে , অশোকের ধর্ম ও হিন্দু ধর্ম অভিন্ন। 

এই সমস্ত যুক্তিগুলি থাকা স্বত্বেও বলা যেতে পারে যে , অশোক যে ধর্মপ্রচার করেছিলেন তা হুবহু বৌদ্ধধর্ম ছিল না। এতে নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের কোনও স্থান ছিল না এবং বৌদ্ধ সংঘের সাথে জড়িত থাকার কোনো নির্দেশও তিনি দেন নি। প্রকৃতপক্ষে , অশোকের ধর্ম ছিল মানবধর্মী। এর লক্ষ্য ছিল মানুষের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগরিত করা। রোমিলা থাপারের  

ভাষায়  –     It was a plea for the recognition of the dignity of man and for a humanistic spirit in the activities of society ‘’.

( A History of India – vol 1, Page 86 )  

ধর্মপ্রচারের জন্য অশোকের পদক্ষেপ :-

রাজা হিসেবে অশোক রাজকর্তব্য সম্পর্কে এক নতুন আদর্শ অনুসরণ করেছিলেন। রাজ্ কর্তব্য সম্পর্কে তাঁর এই আদর্শ বিশ্বের ইতিহাসে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। তিনি ঘোষণা করেছিলেন – 

“ All men are children and just as I desire for my children that they may obtain every kind of welfare and happiness both in this and the next world ; so do I desire for all     men .’’

( Rock Edict VI ) 

অশোক বিহার যাত্রার পরিবর্তে ধর্মযাত্রা প্রচলন করেন। বৌদ্ধ তীর্থস্থান পরিভ্রমণ , ধর্মসভার আহ্বান , বুদ্ধের বাণী প্রচার করে তিনি জনসাধারণকে ধর্মভাবাপন্ন করে তুলতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। জনসাধারণের মনে ধর্মাভাব উন্মেষের জন্য তিনি পর্বতগাত্রে , রাস্তার পাশে প্রস্তরখন্ডে ধর্মের মূল তত্ত্বগুলি উৎকীর্ণ করার ব্যবস্থা করেছিলেন। ধর্মের প্রতি মানুষের আকর্ষণ জাগিয়ে তোলার জন্য তিনি ” রাজুক ” , ” যুত ” , ” মহামাত্র ” উপাধিধারী রাজকর্মচারী নিযুক্ত করে সর্বত্র ত্রিবার্ষিক ও পঞ্চবার্ষিক পরিক্রমার ব্যবস্থা করেছিলেন। জনসাধারণ যাতে নীতিপথে চলে এবং রাজকর্মচারীগণ কর্তৃক নির্যাতিত না হয় সেজন্য তিনি ” ধর্মমহামাত্র ” নামে অপর এক শ্রেণীর রাজকর্মচারী নিযুক্ত করেন। 

 বৌদ্ধধর্মের বিশুদ্ধতা ও বৌদ্ধ সংঘের ঐক্য বজায় রাখার জন্য তিনি পাটলিপুত্র নগরে তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতি আহ্বান করেন। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন মোগগালিপুত্ত। এই সভার সিদ্ধান্ত সারনাথ স্তম্ভলিপিতে উৎকীর্ণ করা হয়। তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতির সিদ্ধান্ত অনুসারে তিনি ধর্মপ্রচারকদের কাশ্মীর ও গান্ধার , নেপাল , মহারাষ্ট্র , মহীশূর , বারাণসী , দাক্ষিণাত্যের পান্ড্য , সত্যপুত্র , কেরলপুত্র – প্রভৃতি অঞ্চলে পাঠিয়েছিলেন। 

বহিঃ রাষ্ট্রে ধর্মপ্রচার :-

” মহাবংশ ” নামক বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ আছে যে , অশোক তাঁর দূতগণকে তামিলরাজ্যের বিভিন্ন অংশে প্রেরণ করেছিলেন। সিংহলে দূত হিসেবে অশোক তাঁর পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রাকে প্রেরণ করেছিলেন। ” মহারক্ষিত ” উপাধিধারী প্রচারকদের সিরিয়া , মিশর , ম্যাসিডনিয়া , এপিরাস – ইত্যাদি গ্রীক দেশ সমূহে প্রেরণ করেছিলেন। বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে জানা যায় যে , অশোক গ্রিক দেশগুলিতে মানুষ ও পশুদের জন্যও চিকিৎসালয় স্থাপন করেছিলেন। সুতরাং অশোকের এই জনহিতকর ও মানবিক কার্যাবলী গ্রীকদের স্পর্শকাতর মনের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। ” সিলভাঁ লেভি ” – র রচনা থেকে জানা যায় যে , অশোকের তিরোধানের অল্পকালের মধ্যে বহু গ্রীক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে। অশোক তাঁর ত্রয়োদশ প্রস্তর লিপিতে দাবী করেছেন যে , তাঁর প্রেরিত দূতরা গ্রীক শাসিত মিশর , সিরিয়া , সাইরিন এবং এপিরাসের রাজসভায় সমাদৃত হয়েছিলেন। সুতরাং এ যে অশোকের ধর্মপ্রচারের ফলশ্রুতি তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে অশোকের ধর্মপ্রচারকেরাই যে আফ্রিকা ও গ্রীক দেশগুলিতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে সফল হয়েছিলেন এমন কথাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। 

ঐতিহাসিক স্যান্ডার্স এর মতে , অশোকের ধর্মপ্রচারকেরা এশিয়া , ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন অধিবাসীদের মধ্যে কৃষ্টিমূলক প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিলেন। বৈদেশিক কয়েকটি রাষ্ট্রে অশোক জনহিতকর প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছিলেন। 

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Invision pharma ltd. Compitative exams mcq questions and answers. Photoshop dm developments north west.