অবসরের গান’ কবিতাটির ভাববস্তু বিশ্লেষণ করো।   অথবা  ‘অবসরের গান’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।   অথবা  ‘অবসরের গান’ কবিতাটিতে সর্বব্যাপী নিরাশ্রয়তার যন্ত্রণা কীভাবে ব্যক্ত হয়েছে, আলোচনা করো।

জীবনানন্দ দাশের রচিত একটি বৃহত্তম কবিতা হলো ‘অবসরের গান’। ১৮টি স্তবক ও তিনটি অংশে বিভক্ত কবিতাটি ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। কবিতাটিতে একাধিক চিত্রের সমন্বয়ে কবি পল্লীপ্রকৃতি এবং মানুষের বিবর্ণ মৃত্যু আর জীবনের পরম পরিণতির চিত্রকে তুলে ধরেছেন।

কবিতাটির শুরুতেই রয়েছে পাকা ফসলে পরিপূর্ণ কার্তিক মাসের বাংলার প্রকৃতির এক অসাধারণ চিত্র। কবি জানিয়েছেন, তিনি এক পাকা ফসলে পরিপূর্ণ ক্ষেতের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ভোরের রোদ এসে পড়ছে ধানের উপর। চারিদিকে ঘাসের গন্ধ আর শিশিরের ঘ্রাণ। একটা অলস অবসন্ন প্রকৃতি। আসলে কার্তিক মাসের ধান পাকার এই সময়টি বাংলার কৃষকদের অবসরের সময়। কারণ, কিছুদিন পরেই পাকা ফসল কেটে ঘরে তোলা হবে। তাই চারিদিকে যেন উৎসবের গন্ধ, সেই উৎসবের চিত্র আঁকতে গিয়ে কবি লেখেছেন-

“চারিদিকে এখন সকাল-

রোদের নরম রং শিশুর গালের মতো লাল;

মাঠের ঘাসের পরে শৈশবের ঘ্রান

পাড়াগাঁর পথে ক্ষান্ত উৎসবের এসেছে আহ্বান।” এই উৎসব শুধু মানুষের নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীকূলেরও। তাইতো—

“পেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রানে ভরা আমাদের ভাড়ারের দেশে!” ‘ভাঁড়ারের দেশ’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে কবি বাংলাদেশের শস্য- সমৃদ্ধির বিষয়টিকে নির্দেশ করতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে এখানে প্রকাশিত হয়েছে আনন্দ, উল্লাস। রূপশালী ধান আর বাংলাদেশের কৃষকদের শরীরের গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ফসলের “স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পারিতেছে শিশিরের জল”, “বিয়োবার দেরি নাই” বর্ণনাগুলি যথেষ্ট অর্থবহ। কারণ, এই সকল বর্ণনার মধ্য দিয়েই ফসল তথা জীবনের পরিপূর্ণতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আবার “গাছের ছায়ার তলে মদ ল’য়ে কোন্ ভাঁড় বেঁধেছিলো ছড়া!” এখানে আসলে জীবনরসে পূর্ণ কবির আনন্দময় মানসিকতারই প্রকাশ ঘটেছে। কবি এই আনন্দময় জীবনই পেতে চান, কিন্তু না পাওয়ার কথা ভেবেই তৈরী হয় অবসাদ। আর অবসাদ হলো মৃত্যু সমতুল্য। কবি লিখেছেন— “চলে গেছে পাড়াগাঁর আইবুড়ো মেয়েদের দল।” মেয়েদের দলের চলে যাওয়ার অর্থ- যৌবন চলে যাওয়া। তখন সবুজ ঘাস, নীলাকাশ সব কিছুই বিবর্ণ হয়ে যায়।

কবিতাটির দ্বিতীয় অংশে আছে রাত্রির চিত্র। রাত হবার সঙ্গে সঙ্গে পেঁচা আর ইঁদুরের দল মাঠে নামে। কবিও বুকভরা পিপাসা নিয়ে মাঠের পাশে এসে দাঁড়ান। পাকা ফসলে পরিপূর্ণ মাঠ কবির মনের মৃত্যুভয়, সামাজিক প্রতিষ্ঠা আর বিষয় বাসনা লাভের আকাঙ্ক্ষাকে ভুলিয়ে দেয়। হৃদয়ে জেগে থাকে শুধু প্রেম ও জীবনের প্রতি ভালোবাসা। আকাশে চাঁদ ডুবে যায়, পেঁচার ডাকে- মৃত্যুর ভাবনা পরিস্ফুট হয়েছে। কবির শেষ ইচ্ছা-

“আমাদের শেষ হবে যখন সে চলে যাবে পশ্চিমের পানে, এটুকু সময় তাই কেটে যাক রূপ আর কামনার গানে।”

মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে চূড়ান্ত ভোগ করার বাসনাই এখানে প্রবল হয়ে উঠেছে।

তৃতীয় অংশে কবি যেন ক্লান্ত, অবসন্ন। তিনি বলছেন-

“এখানে নাহিকো কাজ- উৎসাহের ব্যথা নাই, উদ্যমের নাহিকো ভাবনা;

এখানে ফুরায়ে গেছে মাথার অনেক উত্তেজনা।”

কবি এখন আর রূপ-কামনার গান শোনেন না। মাঠে যাওয়ার, পাকা ফসলের ক্ষেত দেখার সাধও নেই আর। এখন শুধু পালঙ্কে শুয়ে শুনতে চান সমুদ্র থেকে ভেসে আসা ঘুমের গান। তাই বলে ঘুম তথা মৃত্যুও কি তাঁর কাম্য? তিনি বলছেন- “এখন পালঙ্কে শুয়ে কাটিবে অনেক দিন জেগে থেকে ঘুমাবার সাধ ভালোবেসে।” এটাই বোধহয় মৃত্যুর জন্য বিলাসিতা। কবি মৃত্যু চান না, কিন্তু বেঁচে থেকে মৃত্যুর কথা ভাবতে চান। এক সৌন্দর্যহীন, প্রেমহীন জীবন কাটাতে চেয়েছেন তিনি। আসলে মানুষের অবসর জীবনের কর্মহীন ভাবকল্পনার জগতকেই কবি এখানে ব্যক্ত করেছেন। এখানেই কবিতাটির সার্থকতা এবং নামকরণ সার্থক

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

B pharmacy 3rd semester notes pdf download. Hmo refurb dm developments north west. Yangzhou university scholarships 2024.